হাসান আল মাহমুদ >>
আন্দোলনরত আট রাজনৈতিক দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদেরের সভাপতিত্বে এই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জোট গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী প্রচার–প্রচারণা চালাবে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে পরবর্তী করণীয় চূড়ান্ত করা হবে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রত্যেক দল পৃথক কর্মসূচি পালন করবে এবং কার্যক্রম বেগবান করতে জেলা–উপজেলাভিত্তিক লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে আট দলের মধ্যে আসন–সমঝোতার আলোচনা আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত নেতারা
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আজাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, জাগপার মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কাজী নিজামুল হক নাঈম প্রমুখ।
গণভোট ও কর্মসূচির ঘোষণা
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ড. আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, ‘আমরা গণভোট আগে হওয়ার দাবিসহ পাঁচদাবিতে অনড়। তবে সরকারের আহ্বানে আন্দোলন থেকে সরে এসেছি। তারপরও আমরা মনে করি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট হওয়া উচিত। না হলে সমস্যা হতে পারে।’
তিনি জানান, সরকার যেহেতু একই দিনে নির্বাচন–গণভোট আয়োজন করতে চায়, তাই জোট হ্যাঁ–ভোটের পক্ষে দেশব্যাপী র্যালি, আলোচনা সভা ও সেমিনার করবে। বিজয় দিবস উপলক্ষেও দলগুলো পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী জোট নই। তবে ‘এক ভোট বাক্স নীতি’তে আমরা এক। একটি আসনে আট দলের পক্ষ থেকে একজন প্রার্থী হবে এবং সবাই তাকে বিজয়ী করতে কাজ করবে।’
আজ থেকেই প্রার্থী যাচাই–বাছাই শুরু হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিতে জোট কাজ করছে। তফসিল ঘোষণার পর পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।
আট দলের আসন সমঝোতা: ইতিবাচক অগ্রগতি
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত–চরমোনাইসহ আট দলের সমন্বয়ে গঠিত ইসলামী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আসন–সমঝোতার হোমওয়াির্ক চলছে। জোটের বিভিন্ন নেতা জানিয়েছেন—আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং দলগুলোর মধ্যে আস্থা–সম্প্রীতি আগের তুলনায় আরও দৃঢ় হয়েছে।
জোটের নেতাদের ভাষায়, জনগণের সামনে ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি’ হয়ে দাঁড়ানোর যে পরিকল্পনা ছিল—এই সমঝোতা তার ভিত্তি আরও দৃঢ় করেছে।
জামায়াতের আসন ছাড়ার ঘোষণা
জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান জানান, ‘আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমান বলেছেন—সমঝোতার প্রয়োজনে নিজের আসনও ছেড়ে দেবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আটটি দল আন্দোলনরত অবস্থায় রয়েছি। আনুষ্ঠানিক জোট নই, তবে আসন সমঝোতা করব। খুব দ্রুতই সমঝোতা সম্পন্ন হবে। আমাদের মধ্যে ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান ও ভ্রাতৃত্ববোধ খুবই দৃঢ়।’
জোটের উদ্দেশ্য: জনগণের স্বার্থে ঐক্য
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের প্রকৃত আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যেই আট দলের এই ঐক্য।’
তিনি বলেন, ইসলামী ধারার বিভিন্ন দল এক প্ল্যাটফর্মে আসায় মানুষের আস্থা বেড়েছে এবং এর ফলে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
আসন বণ্টনের নীতিমালায় প্রাধান্য যেসব বিষয়
আটদলের লিঁয়াজো কমিটির সদস্য নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল। আসন সমঝোতা নিয়ে আলাপ–আলোচনা চলছে। প্রতি দলের হোমওয়ার্ক হচ্ছে। মাঠে যারা উঠে আসবেন এবং জাতীয়ভাবে যারা গুরুত্বপূর্ণ—প্রাধান্য তাঁদেরই দেওয়া হবে।’
জোটের আলোচনায় উপস্থিত একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়—আসন বণ্টনে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—সাংগঠনিক শক্তি, পূর্বের নির্বাচনের ফলাফল, স্থানীয় জনসমর্থনের জরিপ
তিনি বলেন, ‘যে আসনে যে দল শক্তিশালী, প্রাধান্য সে দলই পাচ্ছে। কাউকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না।’
প্রতিযোগিতা নয়, সমঝোতা
জোট সূত্র জানায়, আটদলের নীতি ও কৌশল প্রণয়নে তাদের অংশগ্রহণ সক্রিয়। এক নেতার ভাষায়, ‘যে এলাকায় উভয় দলের শক্তিশালী প্রার্থী আছে, সেখানে যৌথ জরিপের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।’
দ্বন্দ নয়, বাড়াবে একতা
আসন সমঝোতা করতে গিয়ে কোনো দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা আছে কি না—এ প্রশ্নে মাওলানা মুসা বিন ইজহার বলেন, জোটের সিদ্ধান্ত হবে ‘পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তবতাভিত্তিক।’
জামায়াতের একজন নেতা জানান, জোট একটি ত্রিমাত্রিক ফর্মুলায় কাজ করছে। এক- জনসমর্থন , দুই সক্ষমতা ও তিন সাংগঠনিক শক্তি। জোটের আরেক নেতা জানান, জোটের অভিন্ন ইশতেহার তৈরির কাজ শেষ ধাপে।
মাওলানা মুসা বিন ইযহার বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে জনগণ এই জোটকে বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখছে। সাড়া অত্যন্ত ইতিবাচক।’
জোটের আরেক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও জোটের সমন্বিত অগ্রগতি মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন।
জোটকে ‘অস্বাভাবিক বা আদর্শগত মিশ্রণ’ বলে যারা সমালোচনা করছেন—তাদের জবাবে আটদলের এক দায়িত্বশীল বলেন, ‘জনগণের দাবিতে গড়ে ওঠা ঐক্য কখনো অস্বাভাবিক নয়। জাতীয় স্বার্থে আমাদের মধ্যে পূর্ণ মিল রয়েছে।’
নেতারা জানান, সমঝোতা ভাঙার কোনো আশঙ্কা নেই; বরং ধারাবাহিক আলোচনায় আটদল আরও সুসংহত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, একসঙ্গে আন্দোলন করা ৮ দল হলো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি। দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট আয়োজন, নির্বাচনে উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, আওয়ামী সরকারে বিচার দৃশ্যমান করা, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা’র ৫ দাবি নিয়ে মাঠে সরব রয়েছে।
হাআমা/
