হাসান আল মাহমুদ >>
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা শহীদ শরিফ ওসমান হাদির শেষ বিদায় শোক গড়িয়ে রূপ নেয় ক্ষোভে। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ—রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো শনিবার পরিণত হয় শোক, প্রতিবাদ ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জানাযা ও দাফনের মধ্য দিয়ে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ বিদায়ের সাক্ষী হলো ঢাকা।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুর ২টা ৩৩ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শরিফ ওসমান হাদির জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন তার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। সারা দেশ থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ এতে অংশ নেন। জানাযাকে ঘিরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, খামারবাড়ি, আসাদ গেট ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

সংসদ ভবন মাঠ পেরিয়ে আশেপাশের সকল এলাকায় ছেয়ে যায় লোকারণ্য
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের সড়কে মানুষের ঢল নামে। সকাল সাড়ে ১০টায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আর্চওয়ে গেট দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশের অনুমতি দিলে দক্ষিণ প্লাজা দ্রুতই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জনতার স্রোত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের পুরো এলাকায়। উপস্থিত অনেকেই জানান, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে এত বড় জানাযা তারা দেখেননি।
জানাযায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও অংশ নেন।

জানাজা পূর্ব বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুযহাম্মদ ইউনূস
জানাজার আগে এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ওসমান হাদি আমাদের বুকের ভেতরেই থাকবেন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন তার সংগ্রাম মানুষ স্মরণ করবে।’
জানাযা শেষে বিকেল ৩টা ৪৮ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে সমাহিত করা হয়। দাফনের সময়ও সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। কান্না, স্লোগান ও নীরবতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় তার শেষ বিদায়।
দাফনের পরপরই শোক দ্রুত রূপ নেয় ক্ষোভ ও আন্দোলনে। বিকেল সাড়ে ৪টার পর জানাযা ও দাফন শেষে মিছিল নিয়ে ছাত্র-জনতা শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে শুরু করে। বিকেল ৪টা থেকে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে সেখানে আন্দোলন শুরু হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, শাহবাগ মোড়ে হাজারো মানুষ অবস্থান নেন। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেককে সেখানেই আসরের নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। আন্দোলনকারীরা ‘ইনকিলাব, ইনকিলাব—জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘দিল্লি না ঢাকা—ঢাকা, ঢাকা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পাশাপাশি শাহবাগ মোড়ের নাম পরিবর্তন করে ‘হাদি চত্বর’ রাখার দাবিও তোলেন তারা।

সংসদ ভবনের মূল মাঠের দৃশ্য
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, আগামীকাল বিকেল সোয়া ৫টার মধ্যে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট জবাব না এলে আবারও শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। তিনি বলেন, সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
জানাযায় অংশ নিতে আসা গাজীপুরের এক যুবক বলেন, ‘ওসমান হাদি শুধু একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তাকে হারিয়ে আমরা একজন সাহসী কণ্ঠ হারালাম।’
চট্টগ্রাম থেকে আসা এক প্রবীণ ব্যক্তি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক জানাযা দেখেছি, কিন্তু এমন আবেগ আর মানুষের ঢল খুব কম দেখেছি। এটা প্রমাণ করে, তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজ তাকে দাফন করা হলো, কিন্তু তার আদর্শ দাফন করা যাবে না।’
উল্লেখ্য, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর ও পল্টন এলাকায় গণসংযোগকালে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা রিকশায় থাকা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

জনসমুদ্রে শ্রদ্ধায় ওসমান হাদি
১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। শনিবার বেলা পৌনে ১১টায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে গোসল করানো হয়। পরে সহযোদ্ধা ও সমর্থকদের বিশাল মিছিলের মাধ্যমে মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ও ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. মো. আব্দুল আহাদ জানান, পরিবারের ইচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শনিবার দেশব্যাপী একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়। এ উপলক্ষে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।
হাআমা/
