হাসান আল মাহমুদ >>
দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর মধ্যে ঘোষিত নির্বাচনী সমঝোতা। এই সমঝোতাকে কেন্দ্র করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত মিলছে।
রোববার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই সমঝোতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তিনি জানান, এর আগে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি রাজনৈতিক দল একটি অভিন্ন রাজনৈতিক বোঝাপড়ার আওতায় আসনভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাম্প্রতিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় সেই জোটে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। ফলে সমঝোতায় অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সংখ্যা বেড়ে এখন ১০-এর কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে।
শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে আসন সমঝোতা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে ভোট বিভাজন রোধ করে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা।
তিনি আরও জানান, কয়েকটি রাজনৈতিক দল এই জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বর্তমান বাস্তবতায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে যে শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, এই সমঝোতা তারই একটি প্রতিফলন। আগে থেকেই জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি আসনভিত্তিক সমঝোতার আওতায় একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছিল।
নতুন করে এনসিপি ও এলডিপির যুক্ত হওয়ায় জোটটির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনসিপি নিজেকে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে এলডিপি দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয়। এই দুই দলের যুক্ত হওয়া জোটের পরিধি ও সম্ভাব্য ভোটভিত্তি বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই সমঝোতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, আদর্শিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কেবল নির্বাচনী হিসাবের ভিত্তিতে গঠিত জোট দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের ধারণা, বর্তমান বাস্তবতায় বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া সরকারবিরোধী রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা কঠিন।
সংবাদ সম্মেলনে নির্দিষ্ট আসন বণ্টন বা নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ না করা হলেও জামায়াত আমির জানান, প্রয়োজন হলে তা সময়মতো জানানো হবে। তিনি বলেন, দেশের মানুষের অধিকার, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছে এবং সেই লক্ষ্যেই যৌথভাবে কাজ করা হবে।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এই সমঝোতা মাঠপর্যায়ে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে সাংগঠনিক শক্তি, ভোটারদের সাড়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথের ওপর।
নির্বাচনী সমঝোতার প্রার্থী চূড়ান্ত কখন ? যা জানালেন নাহিদ ইসলাম
এদিকে জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুক্ত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রোববার (২৮ ডিসেম্বর) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোটের সঙ্গে একসঙ্গে নির্বাচন করছি। আমরা সবাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কাজ করব। কে কোন আসন থেকে নির্বাচন করব তা আগামীকাল (সোমবার) আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। জোটের বাইরে আমাদের আলাদা কোনো প্রার্থী থাকবে না। ওই সব আসনে আমরা জোটের পক্ষে কাজ করব।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সেখানে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা করে যাচ্ছিল। আমরা সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। আমাদের দলের পক্ষ থেকে এবং সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর জন্য আজকের এই তাৎক্ষণিক প্রেস ব্রিফিং।
নাহিদ বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির পক্ষ থেকে আমরা প্রথম থেকে বলে এসেছি যে, আমরা আসন্ন এই নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করতে চাই। আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে চাই। সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা চলছিল। আমরা সারাদেশ থেকে মনোনয়ন আহ্বান করেছিলাম, যারা প্রার্থী হতে চায়। পরে আরও দুটি দলের সাথে আমাদের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছিল। সংস্কার প্রশ্নে তখন আমরা বলেছিলাম যে আমরা তিনটি দল মিলে যে সংস্কার জোট, আমরা একত্রে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।
তিনি আরও বলেন, শরিফ ওসমান হাদির যে শাহাদাত বরণ এবং তাকে প্রকাশ্যে গুলি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেক বেশি পরিবর্তন হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড, এই শাহাদাত বরণের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারছি, বাংলাদেশ আধিপত্যবাদী আগ্রাসনী শক্তি এখনো কার্যকর রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যাদেরকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, তারা নির্বাচন বানচাল করার জন্য এখনো চক্রান্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
দল থেকে পদত্যাগের হিড়িক, এনসিপি নেতা মাওলানা সানাউল্লাহ খানের প্রতিক্রিয়া
এনসিপির নেতা মাওলানা সানাউল্লাহ খান বলেছেন, দলটি বর্তমানে একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় পার করছে। দলের ভেতরে আদর্শিক মতপার্থক্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপতৎপরতা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের চাপ—সব মিলিয়ে এনসিপির সামনে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরীক্ষা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতিকে আমি নেতিবাচক নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার একটি সুযোগ হিসেবে দেখি। পরীক্ষা যত কঠিন হয়, সফলতার ভিত্তিও তত মজবুত হয়।”
দলের ভেতরে পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত ও গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও সংকটকালে সংগঠনকে দুর্বল করে এমন সিদ্ধান্ত দায়িত্বশীল নয়।
তিনি আরও বলেন, “দলের প্রতি সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও এই সময়ে ঐক্য ও ধৈর্য ধরে এগোনোই সবচেয়ে জরুরি। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান সংকট মোকাবিলা করে এনসিপি আরও সুসংগঠিত ও পরিণত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এনসিপির ভেতরের মতপার্থক্য আলোচনা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান হবে এবং এতে দল ও বৃহত্তর রাজনীতির স্বার্থই রক্ষা পাবে।
হাআমা/
