আতাউল্লাহ নাবহান মামদুহ >>
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকদের একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, গত বছরের শুরুর দিকে বাইপাস সার্জারির পর ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে একজন ভারতীয় কূটনীতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন, যা সে সময় গোপন রাখতে অনুরোধ করা হয়েছিল।
বাসভবনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির রয়টার্সকে বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকেরা যেমন প্রকাশ্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, ভারতীয় কূটনীতিক সে রকম করেননি এবং বৈঠকটি গোপন রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। তবে তিনি নিজে বৈঠকটিকে গোপন রাখার পক্ষে ছিলেন না বলে জানান।
ড. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের সবার কাছে উন্মুক্ত হতে হবে। সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়া বিকল্প নেই।” তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়তে চায় না; বরং সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করলেও ভারত সরকারের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা স্বাভাবিক কূটনৈতিক চর্চা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী আগামী নির্বাচনে শক্ত অবস্থান নিতে যাচ্ছে এবং দলটি ‘ঐক্যের সরকারে’ অংশ নিতে আগ্রহী। দলটির মতে, অন্তত পাঁচ বছর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দলগুলোর ঐকমত্য প্রয়োজন। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে ঐক্যের সরকারের অভিন্ন এজেন্ডা করার কথাও বলেন জামায়াত আমির।
এদিকে বৈঠকটি ঘিরে সমালোচনাও উঠেছে। বিশিষ্ট লেখক ও সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুনির আহমাদ বলেন, ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ এবং দীর্ঘদিন বিষয়টি প্রকাশ না হওয়া রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাঁর ভাষায়, “অন্য দেশের সঙ্গে প্রকাশ্য বৈঠক হলে ভারতের সঙ্গে কেন রাখঢাক—এটাই মানুষের প্রশ্ন।”
তবে এই সমালোচনার জবাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘গোপন বৈঠক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, জামায়াত আমির নিজেই রয়টার্সকে বৈঠকের কথা বলেছেন এবং পরবর্তীতে আলোচনা হলে তা প্রকাশ্য হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন।
সারজিস আলম অভিযোগ করেন, কিছু মিডিয়া হাউজ রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ব্যবহার করছে। তাঁর ভাষায়, “আগে যারা আওয়ামী লীগকে সার্ভ করত, তারা এখন নতুন ঠিকানা খুঁজছে।”
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকটির চেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও প্রচার। ফলে এটি কেবল কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি প্রতিচ্ছবিও হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সে সাক্ষাৎকারের তথ্য দেশি গণমাধ্যম ভুলভাবে পরিবেশন করেছে: জামায়ত আমির
এদিকে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের তথ্য বাংলাদেশি গণমাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে জামায়াত আমিরের গোপন বৈঠক’ এভাবে বাংলাদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা ভুল।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক বার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
তার দাবি, ‘আন্তর্জাতিক মিডিয়া রয়টার্স–কে গতকাল দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রয়টার্সের একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ভারত যেহেতু আপনাদের প্রতিবেশী দেশ, তাদের সঙ্গে আপনাদের কোনো যোগাযোগ আছে কি না, কোনো কথাবার্তা বা বৈঠক হয় কি না।’
তিনি বলেন, ‘আমি তখন বলেছিলাম, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আমি অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে যখন বাসায় ফিরি, তখন দেশ-বিদেশের অনেকেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। অন্যান্য দেশের সম্মানিত কূটনৈতিকবৃন্দ যেমন এসেছেন, তেমনি তখন ভারতের দুজন কূটনীতিকও আমাকে দেখতে আমার বাসায় এসেছিলেন। অন্যান্যদের মতো তাদের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে।’
‘আমরা তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় বলেছিলাম, যত কূটনীতিক এখানে এসেছেন, তাদের সকলের বিষয়েই আমরা পাবলিসিটিতে দিয়েছি। আপনাদের এই সাক্ষাৎও আমরা পাবলিসিটিতে দিতে চাই। তখন তারা আমাকে এটি না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আমরা বলেছিলাম, পরবর্তীতে যখনই আপনাদের সঙ্গে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈঠক হবে, তা অবশ্যই পাবলিসিটিতে যাবে। এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই।’- দাবি জামায়াত আমিরের
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি বিস্মিত যে, আমাদের কিছু দেশীয় মিডিয়া ভারতের সঙ্গে জামায়াত আমীরের গোপন বৈঠক হয়েছে বলে সংবাদ পরিবেশন করেছে। আমি এ ধরনের সংবাদের তীব্র নিন্দা জানাই এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত বিষয় না জেনে এমন বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাই।’
হাআমা/
