ইরানে অস্থিরতার পেছনে কারা: ভেতরের ক্ষোভ না বৈদেশিক ষড়যন্ত্র?

তেহরান–ভিত্তিক বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষোভ, সহিংসতা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এসব ঘটনাকে “জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ” হিসেবে উপস্থাপন করলেও ভিন্ন একটি বিশ্লেষণ উঠে আসছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও গবেষকদের কাছ থেকে। তাদের মতে, ইরানে যা ঘটছে তার একটি বড় অংশই অভ্যন্তরীণ নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ফল, যার লক্ষ্য ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করা এবং ভেতর থেকে রাষ্ট্রকে ভাঙন ধরানো।

বিজ্ঞাপন
banner

সরাসরি যুদ্ধ নয়, ভেতর থেকে ভাঙন

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের বদলে ‘প্রক্সি ওয়ার’, ‘রেজিম চেঞ্জ অপারেশন’ ও ‘হাইব্রিড যুদ্ধনীতি’ ব্যবহার করে থাকে। লিবিয়া, সিরিয়া, ইউক্রেন, ভেনিজুয়েলা—এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রথমে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে উসকে দেওয়া হয়, পরে সেটিকে সংগঠিত আন্দোলনে রূপান্তর করা হয় এবং এক পর্যায়ে তা সরকার পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

ইরানের ক্ষেত্রেও বিশ্লেষকরা একই প্যাটার্ন দেখছেন। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে জনজীবন কঠিন করা, তথ্যযুদ্ধ ও মিডিয়া প্রোপাগান্ডা চালানো, সামাজিক বিভাজনকে উসকে দেওয়া এবং সর্বোপরি অভ্যন্তরে ‘দালাল শ্রেণি’ তৈরি করা—এই চারটি কৌশল একসাথে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ: ক্ষোভ তৈরির প্রথম ধাপ

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে বহু বছর ধরেই চাপে রেখেছে। মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, ওষুধ ও প্রযুক্তির ঘাটতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবেই তৈরি করা হয়, যাতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জন্মায় এবং সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তর করা সহজ হয়।

অর্থনৈতিক কষ্টকে কেন্দ্র করে যখন মানুষ রাস্তায় নামে, তখন সেটিকে মানবাধিকার, গণতন্ত্র বা স্বাধীনতার ভাষায় মোড়ানো হয়—যাতে তা আন্তর্জাতিক সমর্থন পায় এবং সরকারের বিরুদ্ধে বৈধতা তৈরি হয়।

মিডিয়া ও তথ্যযুদ্ধ: বাস্তবতা নয়, বয়ান নিয়ন্ত্রণ

ইরান ইস্যুতে পশ্চিমা মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্যাটেলাইট টিভি এবং অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করা হয়—যেখানে সরকারকে একমাত্র দোষী এবং আন্দোলনকারীদের নিখুঁত নায়ক হিসেবে দেখানো হয়।

তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঘটনাগুলোর জটিলতা, সহিংস দিক বা বিদেশি প্রভাব ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হয়। ফলে বিশ্ববাসী একটি অসম্পূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট ছবি দেখে।

‘ভেতরের দালাল’ কৌশল

এই বিশ্লেষণের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো “ভেতরের দালাল” তত্ত্ব। ধারণাটি হলো—যখন কোনো রাষ্ট্রকে বাইরে থেকে আঘাত করা কঠিন হয়, তখন ভেতরে এমন গোষ্ঠী তৈরি করা হয় যারা সচেতন বা অচেতনভাবে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে।

এই গোষ্ঠী হতে পারে রাজনৈতিক কর্মী, মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, এনজিও নেটওয়ার্ক বা সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম। তাদের কাজ হয়—জনগণের ক্ষোভকে নির্দিষ্ট দিকে চালিত করা, সরকারের প্রতি আস্থা নষ্ট করা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা রাজনীতি ও ইরান

ইসরায়েলের দৃষ্টিতে ইরান একটি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার, ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ফলে ইসরায়েলের স্বার্থের সাথেও ইরানকে দুর্বল করার কৌশলগত প্রয়োজন জড়িয়ে আছে।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট ইরানকে শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক হুমকি হিসেবেও দেখে।

ফলাফল: অস্থিরতা, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা

এই বহুমাত্রিক চাপের ফল হচ্ছে—ইরানে সামাজিক বিভাজন বাড়ছে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বিশ্বাস হারায় এবং নাগরিকেরা রাষ্ট্রকে নিজেদের প্রতিনিধি মনে করে না, তখন সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা।

উপসংহার

ইরানে যা ঘটছে তা শুধু “স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন” বা “অভ্যন্তরীণ সংকট” হিসেবে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কৌশলগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং তথ্যযুদ্ধের সমন্বিত প্রয়োগ।

এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক যুগে যুদ্ধ আর শুধু বোমা ও ট্যাংকের মাধ্যমে হয় না—হয় অর্থনীতিতে, গণমাধ্যমে, সংস্কৃতিতে এবং মানুষের মানসিকতায়। ইরান তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222