আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের একাংশ) আসনে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ আসনে মোট ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে তিনজনই কওমি ঘরানার আলেম। তিনজনই নিজ নিজ দলের অনুসারী হলেও ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় আলেম-উলামাদের ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ ভোটার ও স্থানীয় আলেম মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তিনজনের কেউ কি শেষ পর্যন্ত এমপি হতে পারবেন? ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন প্রার্থী হলে কি বিজয় সহজ হতো না?
এ আসনে বিএনপি-জমিয়ত জোটের প্রার্থী হিসেবে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই) প্রার্থী হিসেবে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন হাফেজ নাছির আহমেদ আন-নাছিরী। অপরদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি।
দলীয় ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, কাগজে-কলমে প্রার্থী ৯ জন হলেও বাস্তবে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন ছয়জন। এর মধ্যে তিনজন আলেম প্রার্থী হওয়ায় মূল লড়াইটি জটিল রূপ নিয়েছে।
মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার অষ্টগ্রাম গ্রামের সন্তান মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এক সময় ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রয়াত ইসলামী চিন্তাবিদ সাবেক এমপি মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মুফতি আমিনীর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এবং বিএনপির সঙ্গে জোটের সুবাদে এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন।
হাফেজ নাছির আহমেদ আন-নাছিরী
আশুগঞ্জ উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের সন্তান হাফেজ নাছির আহমেদ আন-নাছিরী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী। হাতপাখা প্রতীক নিয়ে দিন-রাত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন তিনি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশের অনেক কোরআনে হাফেজ আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন বলে দাবি করেন সমর্থকরা। তিনি নির্বাচিত হলে সরাইল-আশুগঞ্জ অঞ্চলকে বিশ্বমানের উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি কওমি ধারার উচ্চশিক্ষিত আলেম। জন্ম ঢাকার কেরানীগঞ্জে হলেও বর্তমানে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় বসবাস করছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় তার একটি আলাদা রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে তিনি মাঠে সক্রিয় এবং নির্বাচনী এলাকায় তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেম ও সাধারণ ভোটার সমর্থক রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আলেম বনাম আলেম প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই আসনের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।
তারা বলেন, ‘তিনজনই আলেম হওয়ায় ভোট কোনো একজনের দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে না। ফলে আলেমদের ভোট বিভক্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত অন্য প্রার্থীদের সুবিধা করে দিতে পারে।’
একজন রাজনৈতিক গবেষক বলেন, ‘ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন আলেম প্রার্থী হলে জয় অনেকটাই সহজ হতো। তিন ভাগে ভোট ভাগ হলে কেউই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় পৌঁছাতে নাও পারেন।’
একজন গবেষক আলেম বলেন, ‘ভোট প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হলেও বাস্তবতা হলো—তিনজন প্রার্থীই ভালো আলেম এবং প্রত্যেকেরই নিজস্ব অনুসারী, আত্মীয়-স্বজন ও শিক্ষার্থী রয়েছে। ফলে ভোট কমবেশি করে হলেও তিন ভাগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঐকমত্য হলে এলাকার অধিকাংশ আলেম এক প্রার্থীর পক্ষেই অবস্থান নিতেন।’
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে তিন আলেমের পৃথক লড়াই নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ঐক্যের অভাব থাকলে আলেম সমাজের শক্তিশালী ভোটব্যাংক ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাআমা/
