মোশাররফ হোসাইন
ইরানের ইসলামিক বিপ্লব শুধু ধর্মীয় আন্দোলনের ফল ছিল না; বরং এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বিভিন্ন মতাদর্শের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য। গণতন্ত্রপন্থী ও ধর্মীয় নেতৃত্বের এই সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত শাহ শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে।
১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাসে, ইসলামিক বিপ্লবের কয়েক মাস আগে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন ইরানের দুই প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতা। তারা হলেন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধান ড. করিম সাঞ্জাবি এবং নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি।
ড. সাঞ্জাবি ছিলেন গণতন্ত্রকামী, উদারপন্থী ও সেক্যুলার ধারার প্রতিনিধি। তার দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইরানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, যিনি ১৯৫৩ সালে তেল সম্পদ জাতীয়করণের সিদ্ধান্তের জেরে CIA-সমর্থিত অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন।
অন্যদিকে, আয়াতুল্লাহ খোমেনি ছিলেন শাহবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় নেতা। ১৯৬৩-৬৪ সালের আন্দোলনের পর তাকে নির্বাসনে যেতে হয় এবং পরবর্তীতে তিনি ফ্রান্সে অবস্থান নেন।
মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, এই দুই নেতা দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে একত্রিত হন। বৈঠকে ড. সাঞ্জাবি একটি খসড়া ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন, যেখানে বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ইসলাম’—এই দুই মূলনীতি প্রস্তাব করা হয়।
খোমেনি এই খসড়ায় নিজের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ যুক্ত করেন—“ইসতিকলাল” (স্বাধীনতা)। তার মতে, বিদেশি প্রভাবমুক্ত একটি রাষ্ট্র গঠনই ছিল বিপ্লবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এর ফলে ইরানের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দাঁড়ায় তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর—গণতন্ত্র, ইসলাম এবং স্বাধীনতা। বিশেষ করে ‘স্বাধীনতা’ নীতিটি পরবর্তীতে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতিগত অবস্থানের কারণে ইরানকে গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, চাপ ও বিভিন্ন সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে দেশটি তার অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লব প্রমাণ করে যে, ভিন্ন মতাদর্শের বিরোধী শক্তির ঐক্য একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, নীতিগত অবস্থান ধরে রাখতে একটি জাতিকে কতটা মূল্য দিতে হতে পারে।
এনআর/
