গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে, আর ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল হলো আদালত। কিন্তু যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এজলাসেই সংবাদকর্মীদের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেই ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে দীর্ঘ চার মাস ধরে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে আজ উত্তাল হয়ে ওঠে আদালত চত্বর।
রোববার দুপুরে ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের (এসআরএফ) উদ্যোগে এক ব্যতিক্রমী ও কঠোর প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে মুখে কালো কাপড় বেঁধে ও হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীরা। তাদের দাবি একটাই, অবিলম্বে আদালতের সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং গণমাধ্যমের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটানো।
সাধারণত আদালতের কার্যক্রম উন্মুক্ত থাকা ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত। কিন্তু গত চার মাস ধরে সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে সাংবাদিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এতে করে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
মানববন্ধনে সাংবাদিক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি স্বাধীন দেশে কেন সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া হবে? এই নিষেধাজ্ঞা কেবল সাংবাদিকদের ওপর নয়, বরং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
এদিনের মানববন্ধনে সাংবাদিকদের কণ্ঠে ছিল চরম ক্ষোভ আর প্রতিবাদের সুর। সাংবাদিক নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।
বক্তাদের প্রধান দাবি ও হুঁশিয়ারি:
১. অবিলম্ব প্রবেশাধিকার: আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এজলাসে সাংবাদিকদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা সৃষ্টিকারী সকল অলিখিত নিয়ম বাতিল করতে হবে।
৩. সংবাদ বর্জন: যদি এই অচলাবস্থা নিরসন না হয়, তবে সুপ্রিম কোর্টের সকল সংবাদ সংগ্রহ এবং তা প্রচার থেকে বিরত থাকবেন সাংবাদিকরা।
অর্থাৎ, উচ্চ আদালতের কার্যক্রমের কোনো তথ্য দেশবাসী জানতে পারবে না, যার দায়ভার নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
আজকের এই কর্মসূচিটি ছিল বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের সাথে সংহতি জানিয়ে। বক্তারা অভিযোগ করেন, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ। রাজপথ থেকে আদালত, সবখানেই সাংবাদিকরা আজ অনিরাপদ।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরা নিয়মিত রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হুমকির শিকার হচ্ছেন। সত্য প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা বা অনুরূপ আইনে মামলা দিয়ে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।
বর্তমানে যে সকল সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন, তাদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হয়নি, তাদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।
একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। অথচ আদালতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় প্রবেশাধিকার সীমিত করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। এটি সভ্য সমাজের পরিপন্থী।
মানববন্ধন থেকে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের নেতৃবৃন্দ প্রধান বিচারপতি এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, বিচার বিভাগ এবং গণমাধ্যম একে অপরের পরিপূরক। সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ সংকুচিত করলে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিয়েই মানুষের মনে সন্দেহের দানা বাঁধবে।
সাংবাদিকরা মনে করেন, সুপ্রিম কোর্টের মতো মর্যাদাপূর্ণ স্থানে এই ধরনের ‘সেন্সরশিপ’ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। অবিলম্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সমস্যা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সাংবাদিক সমাজ আরও কঠোর আন্দোলনের ডাক দেবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আজকের কালো কাপড় পরে পালন করা এই মানববন্ধন কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি বাংলাদেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষার একটি প্রতীকী লড়াই। সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত এজলাসের দরজা সংবাদকর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কলম ও ক্যামেরা বিশ্রামে যাবে না।
আদালতের পবিত্রতা রক্ষায় এবং জনগণের তথ্য অধিকার সুনিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের এই আন্দোলন এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই যৌক্তিক দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে কত দ্রুত এজলাসের রুদ্ধদ্বার উন্মোচন করেন।
গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ মানেই গণতন্ত্রের মৃত্যু, এই স্লোগানকে সামনে রেখে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এই দৃঢ় অবস্থান আগামী দিনে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হাআমা/
