লবীব আব্দুল্লাহ :: ১০৬৫ খ্রিস্টাব্দে নিজামুল মুলক তুসি বাগদাদে ঐতিহাসিক নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এরও আগে, ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে ‘মাদ্রাসা ইমাম আবু হানিফা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়। নিজামুল মুলক ছিলেন সেলজুক শাসক আলপ আরসালানের প্রধান মন্ত্রী। তাঁর মন্ত্রিত্বকালে তিনি বাগদাদ, ইস্পাহান, মুছেল, তাবরিস্তান, বসরা, হিরাত, বলখ ও রায় শহরে একাধিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রায় ৩৩৮ বছর সক্রিয় ছিল। পরবর্তীকালে এটি ‘জামে মুস্তানসিরিয়া’-তে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই মাদ্রাসায় হাদীস, কোরআন, ফিকহসহ তৎকালীন যুগের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানও পড়ানো হতো। এখান থেকে অনেক প্রধান বিচারপতি, বড় আলেম ও প্রশাসক তৈরী হতেন। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন এবং তিনিও এক সময় এখানকার ছাত্র ছিলেন।
নিজামুল মুলক শাফি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং নিজামিয়া মাদ্রাসাতেও শাফি মাযহাবের শিক্ষা প্রচলিত ছিল। তিনি মাদ্রাসাগুলোর জন্য ‘ওয়াকফ’ ব্যবস্থা চালু করেন, যার মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হতো। শাসকদের পাশাপাশি সমাজের ধনী, আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাদ্রাসা পরিচালনায় অংশ নিতেন। এ সময় অনেক আলেম কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই শিক্ষা দিতেন এবং শিক্ষার্থীদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থাও করতেন।
প্রথম মাদ্রাসার ধারণাটি নবীজি (সা.)-এর যুগ থেকেই শুরু হয়। মক্কায় দারুল আরকাম এবং পরে মদিনায় মসজিদে নববীর চত্বরের ‘আহলে সুফফা’ ছিলেন এর অন্যতম নিদর্শন। সাহাবায়ে কেরাম যে যেখানে গিয়েছেন, সেখানেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। পরবর্তীতে ইরান, নিশাপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসা গড়ে ওঠে।
সুলতান মাহমুদ গজনবীও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি এবং তাঁর ভাই মাদ্রাসায় ‘সাদিয়া’ নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন এবং ফালাক উরুসুল ফালাক নামক একটি মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা দান করা হতো। এই সময়েই বাইহাকিয়া নামক একটি নিরাপদ শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে।
আগে কিতাবনির্ভর শিক্ষা না থাকলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হতো। গুরুমুখী শিক্ষাই ছিল প্রচলিত। অনেক পেশাজীবী যেমন কাফফাল (তালার মিস্ত্রি), হালুয়াই, জুতার কারিগর, রায় যার-চাল বিক্রেতা, হাদ্দাদ (লোহার কাজ করা), হালাল উপার্জনের মাধ্যমে মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতেন।
আজও সমাজে এমন অনেক শিক্ষক রয়েছেন, যারা নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শিক্ষা দেন। তারা ছাত্রদের থেকে কিছু প্রত্যাশা করেন না আশা রাখেন শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে। বর্তমানেও জনতার দান সহযোগিতা ও অর্থায়নে দারুল উলুম দেওবন্দ বা দেওবন্দী ধারার মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত থাকার স্বার্থেই আয়োজন। জন্য একক কোন পুঁজিপতির প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে তাই সর্বস্তরের দানের আয়োজন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের অনেক রাষ্ট্র মাদ্রাসাকে সন্ত্রাসবাদের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায় যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অপপ্রচার। অথচ মাদ্রাসা ছিল ও আছে মানবতার শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে। এটি মানুষের জীবন, সমাজ এবং আখিরাতের কল্যাণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।
বর্তমানে প্রাইভেট মাদ্রাসাগুলো যেন বাণিজ্যিক না হয়ে পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি যুগের চাহিদা অনুযায়ী মাদ্রাসা শিক্ষাকেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধন করে বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থার আয়োজন করতে হবে। যেন এখানকার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে প্রধান বিচারপতি, প্রশাসক এবং রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়।
সরকার ও সমাজ—দুই পক্ষকেই মাদ্রাসা শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠাতা, দাতা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে মাদ্রাসাগুলো যেন শুধু টিকে থাকে না, বরং সমাজে কার্যকর প্রভাবও ফেলে।
আমরা আশা করি, যারা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছেন, তারা যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম চালু করবেন এবং শিক্ষার্থীদের সুন্দর জীবন গঠনে ভূমিকা রাখবেন। মাদ্রাসা যেন আত্মার প্রশান্তি ও মানবতার শিক্ষা দেয়—এই হোক আমাদের লক্ষ্য। যারা নিঃস্বার্থভাবে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তারা সত্যিকার অর্থেই কল্যাণকামী মানুষ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের শাসকগণ ও সমাজের অভিভাবকদের এমন মনোভাব ও সাহস দিন, যেন তারা দ্বীনি শিক্ষাকে সম্মান করে, প্রমোট করে এবং জঙ্গিবাদের অপবাদ থেকে মুক্ত রেখে একটি উন্নত, প্রশান্তিময় মাদ্রাসা সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট
