ইতিহাস, লোককথা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নীলফামারীর ঐতিহাসিক ‘নীলসাগর’ বর্তমানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে পর্যটক হারাতে বসেছে। এক সময়ের জনপ্রিয় এই বিন্নাদিঘি আজ তার আকর্ষণ হারিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
নীলফামারী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই নীলসাগর। প্রায় ৫৩ দশমিক ৯০ একর আয়তনের এই দিঘির ৩৩ একরই জলরাশি, যার গভীরতা গড়ে ৩০ থেকে ৩২ ফুট। চারপাশে সবুজে ঘেরা পাড় ও বিশালাকার গাছপালা পরিবেষ্টিত এই দিঘিটি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে খনন করা হয়েছে বলে জানা যায়। জনশ্রুতি আছে, মহাভারতের পাণ্ডবদের বনবাসকালে পানির চাহিদা পূরণে রাজা বিরাট এটি খনন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ‘বিরাট দিঘি’ ও পরে ‘বিন্না দিঘি’ নামে পরিচিতি পায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জেলার নামানুসারে এর বর্তমান নামকরণ করা হয় নীলসাগর।
বর্তমানে এই পর্যটন কেন্দ্রের চিত্র বেশ হতাশাজনক। পর্যটন কেন্দ্রটি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। দর্শনার্থী মিজানুর রহমান অভিযোগ করে জানান, আধুনিক যুগে একটি পর্যটন কেন্দ্র যেভাবে গড়ে ওঠা দরকার, নীলসাগর সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এখানে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট। কোনো মানসম্মত খাবারের ক্যান্টিন না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর মতো পরিবেশ না থাকায় অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আরেক দর্শনার্থী রকিবুল আলম বলেন, শিশুদের বিনোদনের জন্য এখানে কোনো রাইড বা পার্কের ব্যবস্থা নেই, যা পর্যটন বিকাশে বড় বাধা।
নীলসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছেন। পর্যটকের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় তাদের বেচাকেনা প্রায় বন্ধের পথে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আদিলুর রহমান জানান, সঠিক উন্নয়ন হলে পর্যটক বাড়ত এবং এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল হতো। তবে আশার কথা হলো, স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে নীলসাগরকে ঘিরে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন সম্পন্ন হলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, সারা বছর পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নীলসাগরকে ঘিরে ইতিমধ্যে নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চলমান কাজগুলো শেষ হলে পর্যটকদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং এখানে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
টিএইচএ/
