প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট উত্থাপন করা হবে আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন)। এদিন বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করবেন।
এটি পাস হলে হবে দেশের ৫৫তম, বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর বাজেটে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, করদাতারা যেন আগে থেকেই নিজেদের করের হার অনুমান করতে পারেন, সেজন্য আগামী ৫ বছরের জন্য একটি প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণার প্রস্তাব করা হতে পারে।
ধাপে ধাপে বাড়ছে করমুক্ত আয়ের সীমা
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় আগামী ৫ বছরের জন্য ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হতে পারে। সম্ভাব্য প্রস্তাবনা নিচে উল্লেখ করা হলো-
জুলাই যোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত গেজেটভুক্ত “জুলাই যোদ্ধা” এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই সীমা শুরুতেই ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে তা বৃদ্ধি পেয়ে হবে ৬ লক্ষ টাকা।
তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতা: এদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা শুরু হচ্ছে ৫ লক্ষ টাকা থেকে।
ব্যক্তিশ্রেণির করহার
সম্ভাব্য প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য করের ধাপগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ না পড়ে।
- প্রথম ৩,৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত: শূন্য (০%)
- পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত: ১০%
- পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত: ১৫%
- পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত: ২০%
- পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত: ২৫%
- অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর: ৩০%
ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর: সমাজের উচ্চবিত্ত বা স্বল্পসংখ্যক ধনী করদাতাদের জন্য ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে ৩ কোটি টাকার বেশি অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫% (৫% অতিরিক্ত) করের প্রস্তাব করা হতে পারে। মধ্যবিত্তরা এই উচ্চহারের আওতার বাইরে থাকবেন।
সেরা করদাতাদের জন্য থাকছে ভিআইপি সুবিধা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাজেটে কর ভিত্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সৎ করদাতাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। “সেরা করদাতা পুরস্কার নীতিমালার” অধীনে মোট ৬৭ জন সর্বোচ্চ করদাতাকে পুরস্কৃত করা হতে পারে।
পুরস্কারপ্রাপ্তরা যেসব বিশেষ সুবিধা পাবেন: জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণ ও অংশ নেওয়ার সুযোগ। সরকারি হাসপাতালে কেবিন সুবিধা এবং সরকারি সার্কিট হাউসে থাকার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার। বিমান, ট্রেন বা অন্যান্য যানবাহনের টিকিট প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের বিশেষ সুবিধা।
তরুণ ও প্রযুক্তি খাতের জন্য ‘মেগা ধামাকা’
দেশের আইটি সেক্টর, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বাজেটে অভূতপূর্ব কিছু সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনে ট্যাক্স একবারে ‘শূন্য’
এতদিন ফ্রিল্যান্সিং বা মেধাভিত্তিক আইটি খাতের কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা থাকলেও, এবারের বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার ও সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বাজেটের সম্ভাব্য প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সব প্রকার ফ্রিল্যান্সিং হতে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। এছাড়া ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্য যেকোনো প্ল্যাটফর্মে সব ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েশন হতে অর্জিত আয়কেও সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হতে পারে।
এটা হলে দেশের লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সার, ইউটিউবার এবং ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের কষ্টার্জিত আয়ের ওপর শতভাগ করমুক্ত সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।
কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফ্রিল্যান্সিং-ই নয়, যারা নতুন আইডিয়া নিয়ে আইটি বা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্যও থাকছে বড় চমক। নতুন স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ওপর কর হার ০% (শূন্য শতাংশ) করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
নারী ও প্রতিবন্ধী আইটি উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা!
প্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে বাজেটে বিশেষ ছাড় দেওয়া হতে পারে। সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের আয় করমুক্ত রাখা হলেও, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য এই সীমা বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হতে পারে। অর্থাৎ, এটি কার্যকর হলে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার হলে নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের কোনো আয়কর দিতে হবে না।
ঢাকার বাইরে নতুন আইটি ও টেক শিল্পে বিনিয়োগে বিশেষ সুবিধা
তরুণদের কর্মসংস্থান ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোনো উৎপাদনমুখী শিল্প, প্রযুক্তি বা পর্যটন খাতের স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির বিনিয়োগের ওপর বিশেষ অবচয় সুবিধা দেওয়া হতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রথম বছরে ৬০% এবং দ্বিতীয় বছরে ৪০% হারে এই ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা পাবেন, যা তরুণদের নতুন আইটি পার্ক বা টেক ফার্ম তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করবে।
সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যে করছাড়
বাজারের মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য কমাতে চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে।
৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ০.৫% কর
এতদিন মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য আমদানির বা সরবরাহের ক্ষেত্রে করদাতাদের ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ কিংবা ১ শতাংশ হারে উৎসে কর পরিশোধ করতে হতো। নতুন বাজেট প্রস্তাবনায় এই বিদ্যমান সব হার একবারে হ্রাস করে মাত্র ০.৫ শতাংশ (দশমিক পাঁচ শতাংশ) নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
যেসব প্রধান পণ্যে মিলবে এই সুবিধা
সরকারের এই কর ছাড়ের তালিকায় থাকতে পারে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৬০টি পণ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেল। এছাড়া গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ এবং বিভিন্ন প্রকার বীজও থাকতে পারে এই তালিকায়।
এই কর ছাড় হলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীদের কার্যকর করভার কমে যাওয়ার কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দ্রব্যমূল্য হ্রাস পাবে এবং দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
ভোজ্যতেলে ১০ বছরের জন্য ‘বড় ছাড়’
নিত্যপণ্যের বাজারের স্বস্তি কেবল এই ০.৫ শতাংশ উৎসে করের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশে ভোজ্যতেলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী ব্যবসায়ের জন্য আগামী ১০ বছরের জন্য শূন্য (০%) শতাংশ কর হারের ঐতিহাসিক প্রস্তাব করা হতে পারে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষা বা অন্যান্য তৈলবীজের তেলের দাম ভবিষ্যতে আরও সাশ্রয়ী হতে পারে।
রিফাইনারি ও জ্বালানি তেলেও সুখবর
খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রেও স্বস্তির খবর থাকছে বাজেটে। রিফাইনারি বা শোধনাগার কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান উৎসে কর কর্তনের হার ১.৫% থেকে কমিয়ে ১% করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে, যা সামগ্রিক পরিবহন ও উৎপাদন খরচ কমাতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখযোগ্য আরও যেসব ক্ষেত্রে করছাড়ের প্রস্তাব দেয়া হতে পারে-
স্বাস্থ্য খাত: কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫% অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হতে পারে, যার ফলে প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ কমবে প্রায় ৬০০ টাকা। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২% থেকে কমিয়ে ১% করা হতে পারে।
পরিবেশবান্ধব যানবাহন: ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক এবং চার্জিং স্টেশন আমদানির উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০% করা হতে পারে। এছাড়া বিআরটিএ-তে ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের অগ্রিম কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সিসি/কিলোওয়াট ভেদে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করা হতে পারে।
স্বর্ণালংকার: স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে ০.৫% করার প্রস্তাব করা হতে পারে। জুয়েলারি সেবার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে।
প্রযুক্তি পণ্য: কম্পিউটার মনিটর, প্রিন্টার ও ফ্ল্যাশ মেমোরি আমদানিতে অগ্রিম কর ৫% থেকে কমিয়ে ২% করা হতে পারে। স্থানীয়ভাবে মোবাইলফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫% ও ২% থেকে কমিয়ে ১% করা হতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২% থেকে কমিয়ে ১০% করা হতে পারে। মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকার কর বাতিল করা হতে পারে।