১৯৪৮ সালের পর সৌদি আরবে এই প্রথম কোনো অমুসলিম কূটনীতিক

by Masudul Kadir

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: সময় বদলায়। সবসময় একই রকম থাকে না। ভারতীয় কূটনীতিও পরিবর্তন হয়েছে। সাত দশক পর সম্পূর্ণ চিন্তা শুরু করেছে ভারত। ১৯৪৮ সালের পর এই প্রথম সৌদি আরবে কোনো অমুসলিম কূটনীতিককে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ভারত। দেশটির কূটনৈতিক ইতিহাসে এটিকে একটি ঐতিহাসিক এবং বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ১৯৯৮ ব্যাচের অভিজ্ঞ কূটনীতিক ‘বিপুল’, যিনি এর আগে কাতারে ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং দুবাই, কায়রো ও জেনেভায় গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ প্রায় আট দশক ধরে চলা প্রচলিত নিয়ম ভেঙে কেন একজন অমুসলিম রাষ্ট্রদূতকে রিয়াদে পাঠানো হলো, তার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ও বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

এত বছর ধরে সৌদি আরবে কেবল মুসলিম কূটনীতিকদেরই রাষ্ট্রদূত হিসেবে রিয়াদে এবং কনসাল জেনারেল হিসেবে জেদ্দায় নিয়োগ দিত নয়াদিল্লি। এর মূল কারণ ছিল মাঠপর্যায়ের হজ ব্যবস্থাপনা। ইন্দোনেশিয়ার পর ভারত থেকেই সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মুসলিম প্রতি বছর হজে যান। এই বিশাল সংখ্যক হাজির ব্যবস্থাপনা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়ের জন্য রাষ্ট্রদূতকে মক্কা, মদিনা কিংবা মিনার মতো পবিত্র স্থানগুলোতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়।

যেহেতু মক্কা ও নির্দিষ্ট কিছু পবিত্র এলাকায় অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার নেই, তাই কোনো জরুরি পরিস্থিতি—যেমন ১৯৯৭ সালের মিনায় অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় ট্র্যাজেডি—তৈরি হলে অমুসলিম রাষ্ট্রদূতের পক্ষে সেখানে গিয়ে তাৎক্ষণিক সমন্বয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ব্যবহারিক ও ভাষাগত সুবিধার কারণেই এতদিন মুসলিমদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের পররাষ্ট্র ক্যাডারে এই পদের জন্য যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ মুসলিম কর্মকর্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যোগ্য প্রার্থীর এতটাই অভাব দেখা দিয়েছিল যে বিগত বছরগুলোতে সরকারকে বর্তমান রাষ্ট্রদূতদের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে, অথবা ২০১৬ সালের মতো কূটনৈতিক পেশার বাইরে থেকে মুম্বাইয়ের সাবেক পুলিশ কমিশনার আহমদ জাভেদকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠাতে হয়েছিল। এবার সেই শূন্যতা দূর করতে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই বিপুলকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

তাছাড়া সৌদি আরব এখন আর ভারতের কাছে কেবল তেল আমদানি বা প্রবাসী শ্রমিক পাঠানোর সাধারণ কোনো দেশ নয়। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অধীনে সৌদি আরব এখন প্রযুক্তি, বড় ধরনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং সংস্কৃতির এক বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এখন রিয়াদ। তাই ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে যার অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা বেশি, তাকেই এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠানোকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিও বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। একদিকে ইরানের সাথে আঞ্চলিক উত্তেজনা, অন্যদিকে ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। এই দ্বিমুখী ও সংবেদনশীল পরিস্থিতি সামাল দিতে একজন অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার কূটনীতিকের প্রয়োজন ছিল, যা বিপুলের প্রোফাইলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের বাজারে দুটি ভিন্ন মত তৈরি হতে পারে। এক পক্ষ দাবি করতে পারে যে ‘নতুন ভারত’ এখন আর পুরোনো সংবেদনশীলতার ধার ধারে না। অন্য পক্ষ বলতে পারে যে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমাতেই প্রতীকীভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুটি ধারণাই আংশিক ও একপেশে। মূলত যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের পরিবর্তিত কৌশলগত প্রয়োজনের তাগিদেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, একে কোনো নিয়মের লঙ্ঘন না দেখে বরং কূটনৈতিক বিবর্তন হিসেবে দেখাই শ্রেয়।

সূত্র: এনডিটিভি।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222