আন্তর্জাতিক ডেস্ক :: জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে আয়ারল্যান্ড ইসরাইলি বন্ড বিক্রির অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করার পর, ইউরোপের অন্যতম ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লুক্সেমবার্গ এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইসরাইলি ওয়ার বন্ড (যুদ্ধ বন্ড) বিক্রির এই সুযোগ করে দেওয়ার পর লুক্সেমবার্গ এখন ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ‘গণহত্যায় অংশীদারিত্বের’ গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর লুক্সেমবার্গের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সিএসএসএফ’ ইসরাইলের একটি বন্ড কর্মসূচির অনুমোদন দেয়। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘ইসরাইল বন্ড’ বিক্রির আইনি পথ সুগম হয়।
এই বন্ডগুলো মূলত ‘স্ট্যান্ড উইথ ইসরাইল। ইসরাইল ইজ অ্যাট ওয়ার’ (ইসরাইলের পাশে দাঁড়ান। ইসরাইল যুদ্ধে লিপ্ত) স্লোগানে বাজারজাত করা হচ্ছে। এর আগে বছরের পর বছর ধরে এই বন্ড বিক্রির কেন্দ্র ছিল আয়ারল্যান্ড। কিন্তু গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে অর্থায়নের বিরুদ্ধে ডাবলিনে ব্যাপক রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের মুখে এর ইস্যুকারী সংস্থা ‘ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন ফর ইসরাইল’ (ডিসিআই) আয়ারল্যান্ড থেকে এই কার্যক্রম লুক্সেমবার্গে স্থানান্তরের আবেদন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী লুক্সেমবার্গের সিএসএসএফ এই আবেদন অনুমোদন করে, তবে অত্যন্ত বিতর্কিত এই রাজনৈতিক বিষয়টি নিয়ে তারা দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে কোনো পরামর্শ করেনি।
সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত এক সম্মেলনে লুক্সেমবার্গের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বন্ড বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ, কারণ এর অর্থ সরাসরি গণহত্যায় অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। যারা এই বন্ড বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে, তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল বন্ডের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭.৭ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সরাসরি ইসরাইলের যুদ্ধকালীন বাজেটে যুক্ত হচ্ছে। বর্তমানে দেশটির মোট সরকারি ব্যয়ের ৩০ শতাংশের বেশি সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত যুদ্ধবিদ্ধস্ত কোনো দেশকে ঋণ দিতে গেলে উচ্চ সুদের ঝুঁকি থাকে। যেমন চলমান যুদ্ধে ইউক্রেন বা রাশিয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ রিটার্ন দাবি করে। কিন্তু ইসরাইল বন্ডের ক্ষেত্রে মাত্র চার শতাংশ রিটার্ন দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, বিনিয়োগকারীরা আর্থিক লাভের চেয়ে আবেগ ও রাজনৈতিক সংহতি থেকে এই বন্ড কিনছেন।
‘ল ফর প্যালেস্টাইন’-এর বিশেষজ্ঞ শাহদ হাম্মুরি জানান, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৪ সালের রুলিং অনুযায়ী ইসরাইলের গণহত্যা ও অবৈধ দখদারিত্বের বিষয়ে সকল দেশকে সহযোগিতা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লুক্সেমবার্গ এই বন্ড অনুমোদন করে স্পষ্টত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং এর পেছনে থাকা কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার আওতায় পড়তে পারেন।
এরই মধ্যে এই বন্ডের নবায়নের জন্য আগামী সেপ্টেম্বর মাসের সময়সীমাকে কেন্দ্র করে চাপ বাড়ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য এবং সমাজকর্মীরা দাবি করছেন, সেপ্টেম্বর মাসে এই বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে লুক্সেমবার্গ যেন এর পুনঃঅনুমোদন না দেয়। লুক্সেমবার্গের বামপন্থী ও গ্রিন পার্টির সংসদ সদস্যরা এই বিষয়ে সংসদে একটি বিশেষ বিতর্ক ও বিল আনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে দেশটির বর্তমান জোট সরকার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘স্বাধীনতার’ অজুহাত দেখিয়ে এই দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
ইউরোপের অন্যতম টেকসই অর্থায়ন এবং পরিবেশ-সমাজ-শাসন বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লুক্সেমবার্গ এই ইসরাইলি বন্ডের কারণে চরম সুনাম সংকটে পড়েছে। দেশটির সিএসএসএফ-এর বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি আড়াল করার অভিযোগে একটি মামলার প্রস্তুতিও চলছে। মানবাধিকার কর্মীদের মূল লক্ষ্য, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে লুক্সেমবার্গসহ সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই বন্ডের বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, যাতে এটি জার্মানি বা অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরিত হতে না পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
