পরবর্তী এশীয় অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় অংশীদার হতে চীনের শিল্পপতিদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী বৈষম্যহীন সব ধরনের সুবিধা পাবেন।
বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। এদিকে চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এসব স্মারক সই হয়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আপনাদের এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু চীনা বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তারা আমাদের জনগণের কর্মক্ষমতা, আমাদের সহনশীলতা এবং আমাদের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে পারেন। তারা বলতে পারেন বাংলাদেশ সফল হতে পারে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চীনা কোম্পানিগুলোকে তাদের মূল্যশৃঙ্খল বাংলাদেশে সম্প্রসারণের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমরা তাদের বৈশ্বিক বাজারে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারি।’
তিনি বলেন, এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তার সরকার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনতে একটি কঠোর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী বৈষম্যহীন সুবিধা, মূলধন ও লভ্যাংশ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা পাবেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলছি। এর মধ্যে রয়েছে আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল।’ তিনি বলেন, ‘এসব অঞ্চলে উন্নত লজিস্টিকস সুবিধা, সমুদ্রবন্দর সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিডা এখন চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষায়িত সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক চালু করেছে। পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষায়িত ওয়েবসাইটও চালু করা হয়েছে, যাতে তারা বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, প্রণোদনা ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজে তথ্য পেতে পারেন।’
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশে প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ চালু করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য খুবই সহজ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা আরও কাছে থাকতে, আরও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে এবং বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজের জন্যে আপনাদের সাহায্য করতে চাই।’
অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও প্রণোদনা নিয়ে একটি বিশেষ উপস্থাপনা তুলে ধরেন। সম্মেলনে ১২৫ জন চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অংশ নেন। এ সময় পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ও চীনের ১৩ সমঝোতা : বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ ও চীন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক বিষয় অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, ১৩টি মোমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিংয়ের মধ্যে রয়েছে-ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন কীভাবে আমরা গ্রিন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে প্রমোট করতে পারি, জয়েন্ট অ্যাকশন প্ল্যানের বিষয়ে কথা হয়েছে।
বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে যেন চীনে আমরা রপ্তানি করতে পারি এবং বিভিন্ন ডেভেলপমেন্টাল কো-অপারেশন নিয়ে কথা হয়েছে। কনসেশনাল লোন অর্থাৎ বাংলাদেশে যে ঋণটা চীন থেকে যাচ্ছে, সেখানে কীভাবে আমরা ইন্টারেস্ট রেট কমাতে পারি, গ্রেস পিরিয়ড বাড়াতে পারি-সেটি নিয়ে কথা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অর্থাৎ যার অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক এলাইনমেন্ট রিলেটেড ম্যানপাওয়ার ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে। একই সঙ্গে হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের একটা ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান সাইন করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের রপ্তানি বিষয়ে একটা এমওইউ হয়েছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, একই সঙ্গে চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন বাংলাদেশে আমরা শুরু করতে যাচ্ছি-আমাদের স্কুল কারিকুলামে সেটি এবং টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল এডুকেশনে কো-অপারেশনে দুটো পৃথক এমওইউ হয়েছে। মিডিয়ার ক্ষেত্রে কিভাবে দুই দেশের কোলাবোরেশন বাড়ানো যায়, থিংক ট্যাংক ফোরাম নিয়ে আমরা কীভাবে সামনের দিকে আগাতে পারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল এবং নিউজ পেপারের ভেতরে চারটা এমওইউ হয়েছে।
বিনিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বোর্ড বিডার সঙ্গে এবং এর পাশাপাশিভাবে পৃথকভাবে আমাদের চিটাগাংয়ের আনোয়ারাতে এবং মোংলাতে কীভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, সেখানে ইকোনমিক জোন দিয়ে আমরা কীভাবে বাংলাদেশের নতুন চীনা ফ্যাক্টরি, চীনা প্রডাকশন ফ্যাসিলিটি এবং এর মাধ্যমে এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করতে পারি, সেগুলো নিয়ে পৃথক এমওইউ হয়েছে।
এর আগে সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’-এ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এ সমঝোতায় সই করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং।
হাআমা/
