হরমুজ প্রণালিতে চলতে হলে মানতে হবে ইরানের নির্দেশনা। অনুমতি ছাড়া কারো চলার সুযোগ নেই। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তেহরানের অনুমতি ছাড়া এই নৌপথ ব্যবহার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে প্রণালিতে ঘোষিত একটি নতুন রুটকে অগ্রহণযোগ্য ও অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করেছে তারা।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তেহরান। সম্প্রতি দেশ দুটির মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা চললেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান রুটটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষই এখন রয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে।
ইরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর তারা সামুদ্রিক সেবা শুল্ক আরোপ করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ। তাই এখানে কোনো ধরনের শুল্ক বা ফি আদায় করা যাবে না।
তেহরানের এই কঠোর হুঁশিয়ারি এটাই স্পষ্ট করে, তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া যেকোনো ধরনের চলাচল রুখে দিতে বদ্ধপরিকর। গত সপ্তাহে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও, জাহাজ মালিকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।
গত শনিবার একটি প্রভাবশালী নৌ-তথ্য সরবরাহকারী গোষ্ঠী বিকল্প শিপিং করিডোরের প্রস্তাব দেওয়ার পর ইরানের পক্ষ থেকে এই নতুন সতর্কতা জারি করা হলো। ওই গোষ্ঠীটি জাহাজ মালিকদের ওমানের জলসীমা দিয়ে দক্ষিণের রুট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল এবং ট্রান্সপন্ডার সিগন্যাল সচল রাখার অনুরোধ করেছিল। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘ওমানি জলসীমার দক্ষিণ রুটটি মাইন-মুক্ত হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এটিই চলাচলের জন্য সুপারিশকৃত পথ।’
শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাহাজ চলাচলে কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত সপ্তাহের শেষে ৯৩টি জাহাজ এই পথ পার হয়েছে, যা আগের একই সময়ের তুলনায় তিনগুণ। তবে এটি যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় অনেক কম, যখন প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত।
মেরিন ট্রাফিক আরও নিশ্চিত করেছে, গত মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ও জ্বালানি বহনকারী ৩১টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে। জাহাজ মালিকরা বর্তমানে ইরান, ওমান এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার নির্ধারিত রুটগুলোর একটি মিশ্রণ ব্যবহার করছেন। তবে সংস্থাটি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, অপারেটররা এখনও অত্যন্ত সতর্কভাবে চলাচল করছেন এবং পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি।
গত মে মাসে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং একে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে ‘চাঁদাবাজি’ চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল বা ফি আদায় ব্যবস্থা সহ্য করবে না এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ তেলের বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তেহরান যদি এই জলপথের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তবে জাহাজ চলাচল হয়তো আর কখনো যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরবে না।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফ্ট বৃহস্পতিবার গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে এক বার্তায় বলেন, ‘আমাদের মতে, সংঘাত শেষ হওয়ার পর যদি ইরান এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখে, তবে এই জলপথ দিয়ে তেলের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালি পারাপারের একমাত্র অনুমোদিত পথ হলো ইরান ঘোষিত রুটটি। এর বাইরে যেকোনো ধরনের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
আপাতত জাতিসংঘের সংস্থা আইএমও এবং ওমানের সমন্বয়ে একটি সাময়িক ব্যবস্থার অধীনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। এই ব্যবস্থায় গত তিন দিনে ৫৭টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। একটি নতুন রুট দিয়ে জাহাজ পার হওয়ার পরই ইরানের পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা এলো।
তবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা এখনও অনিশ্চিত। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাহরাইনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহারের জন্য কোনো দেশের শুল্ক আদায়ের অধিকার নেই।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে রুবিও জানান, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শুল্ক আরোপের দাবির পক্ষে অঞ্চলের কোনো দেশের সমর্থন নেই। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি করার সময় তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকারে থাকবে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক ভাষণে সামরিক বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এমন এক মহাকাব্যিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যা শত্রুরা কখনও কল্পনাও করতে পারেনি। আমাদের শত্রুরা বিশ্বাস করেছিল, তারা মাত্র তিন দিনের মধ্যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটাবে।
