সাপের বিষ থেকে প্রতিষেধক তৈরিতে সাফল্য দেখিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক)। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) দাবি করে বলেছে, সাপ লালন-পালনের লক্ষ্য একটাই, অ্যান্টিভেনম বা প্রতিষেধক তৈরি। এসেছে সাফল্যও। চমেকে গত আট বছর ধরে বিষধর সাপ প্রতিপালনের কাজটি করে যাচ্ছে সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির জন্য। প্রাথমিক গবেষণায় মিলছে সফলতাও।
একটি-দুটি নয়, ৩৫০টি বিষধর সাপের বসবাস চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক)। চন্দ্রবোড়া, রাসেলস ভাইপার, পদ্মগোখরা, সবুজবোড়াসহ নানা জাতের এসব বিষধর সাপের নাম শুনলেই যেখানে গা হিম হয়ে যায়, সেখানে অতিযত্নে প্রতিপালন করা হচ্ছে এসব সাপ!
এরই মধ্যে রাসেলস ভাইপা :রের বিষ মুরগির শরীরে ট্রায়ালের মাধ্যমে তা থেকে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। সফল এই ট্রায়ালের প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। প্রতিবেদনের জবাব মিললে পরবর্তী ধাপগুলো পার হয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য গবেষকরা প্রস্তুত হবেন বলে জানিয়েছেন।
তবে গবেষণা কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তারা। কারণ প্রায় দুই বছর ধরে গবেষণায় সরকারি অর্থ বরাদ্দ বন্ধ থাকায় ঢিমেতালেই কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে বলে জানান গবেষক ও চমেকের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
অধ্যাপক আবু সায়ীদ জানান, আমাদের দেশে প্রতিবছর চার লাখ মানুষকে সাপে কাটে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মারা যায়। আর সাপে কাটার যে অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়, তা ভারতের। সাপের ভৌগোলিক পরিবেশ এবং প্রজাতিগত ভিন্নতার কারণে সব সময় এসব ওষুধ কাজ করে না। এ জন্য দেশে বিচরণকারী সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রকল্পটি চালু রাখা জরুরী।
তবে সংকট নিরসনে নতুন একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে জানান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের বিষয়টি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ও অবগত।
এই গবেষক বলেন, ডিপিপি অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত ঢিমেতালেই চালাতে হচ্ছে গবেষণা কার্যক্রম। অনেকটা স্থবির বলা যায়। কর্মীর সংখ্যা কমেছে। বাড়ানো যাচ্ছে না সাপের সংখ্যাও। কোনোমতে সাপগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতেই এখন মনোযোগী তারা।
গবেষণা কার্যক্রমটির প্রধান গবেষক অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় ভিআরসির সংকট ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরে জানান, ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে একটি উন্নয়ন প্রকল্পে যাওয়ার ট্রানজিশন সময় চলছে। এ সময় কিছু আর্থিক অসুবিধা এবং জনবল কমিয়ে ফেলার মতো সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমনকি সাপের খাবার সরবরাহ করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এখন বিষ সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন, মুরগির শরীরে রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এই অ্যান্টিবডি সাপের বিষ (ভেনম) অকার্যকর করতে পারে। প্রচলিত অ্যান্টিভেনমের তুলনায় এটি কোনো অংশেই কম কার্যকর নয়। এই রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। মূল্যায়ন শেষ হলে পরবর্তী ধাপগুলোতে এগিয়ে যাওয়া হবে। এ ছাড়া সাপের অন্যান্য প্রজাতির প্রতিষেধক তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের আওতায় এই গবেষণা চলছে। চমেকের সহযোগিতায় গবেষণায় যুক্ত রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন, মেডিসিন টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং জার্মানির গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) ক্যাম্পাসে অবস্থিত ভেনম রিসার্চ সেন্টারে প্লাস্টিকের বাক্সে সারি সারি করে রাখা হয়েছে ছোট, বড় ও মাঝারি— বিভিন্ন আকারের সাপ। যেন রাসেলস ভাইপার, পদ্মগোখরা, পিট ভাইপার, সবুজবোড়াসহ বিভিন্ন বিষধর সাপের আবাস। আগন্তুকের উপস্থিতি টের পেয়ে কোনোটি প্লাস্টিকের বাক্স থেকেই তুলছে ফণা, আবার কোনোটি ফোঁসফাঁস শব্দ করছে।
গবেষণা সহযোগী মিজানুর রহমানের মতে, বর্তমানে ১১ প্রজাতির প্রায় ৩৫০ বিষধর সাপ রয়েছে এখানে। অর্ধেক সাপ বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা হয়েছে। বাকিগুলোর জন্ম এখানেই ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে। প্রতি মাসে সাপের বিষ সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা সংরক্ষণ করা হয়।
সাপের কক্ষের পাশের আরেকটি কক্ষে ইঁদুর প্রজনন করা হচ্ছে। সেখানে এরই মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার ইঁদুর রয়েছে। প্রতি মাসে সাড়ে ৩০০ সাপের জন্য দুই হাজারের বেশি ইঁদুর প্রয়োজন হয়। এসব ইঁদুরের খাবার হিসেবে ধান, গমসহ বিভিন্ন শস্য দেওয়া হয়।
বর্তমানে ভেনম রিসার্চ সেন্টারে পাঁচজন কর্মী রয়েছেন। আগে কর্মীর সংখ্যা ছিল ১০ জন। তহবিল সংকটের কারণে কর্মী কমানো হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে সাপ ধরে আনা, প্রতিপালন, ইঁদুর প্রজনন এবং বিষ সংগ্রহ সব কাজই তারা করে থাকেন।
