৩০০ মসজিদ-মাদরাসা গুঁড়িয়ে কোন্ পথে ভারত সরকার?

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

ভারতে মুসলিম স্থাপনার ওপর দমন-পীড়নের ইতিহাস নতুন নয়। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় মসজিদ-মাদরাসা ও মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো নানা উপায়ে দুর্বল করে দেওয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। তবে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারা আরও স্পষ্ট, কাঠামোগত এবং নীতিগত রূপ লাভ করেছে।

বিজ্ঞাপন
banner

সাম্প্রতিক অভিযান: ৩০০ মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস

ভারতের উত্তর প্রদেশে সম্প্রতি চালানো এক কথিত ‘উচ্ছেদ অভিযানে’ প্রায় ৩০০টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার বলছে, এগুলো অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায়। তবে যেসব স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে, তার সবই মুসলিম ধর্মীয়—মসজিদ, মাদরাসা, মাজার এবং ঈদগাহ—এ বিষয়টিই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: ভারত কি তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র হারাচ্ছে?

সরকারি বিবরণ বনাম বাস্তবতা

উত্তর প্রদেশের নেপাল সীমান্তঘেঁষা সাতটি জেলা—মহারাজগঞ্জ, সিদ্ধার্থনগর, বালরামপুর, শ্রাবস্তী, বহরাইচ, লখিমপুর খেরি ও পিলিভীত—এই অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী:

মোট ২২৫টি মাদরাসা

৩০টি মসজিদ

২৫টি মাজার

৬টি ঈদগাহ
ধ্বংস করা হয়েছে ‘অবৈধ’ নির্মাণের অভিযোগে।

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, এসব স্থাপনা অনুমতি ছাড়াই সরকারি বা বন বিভাগের জমিতে নির্মিত হয়েছে। সেই ভিত্তিতে এগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অভিযানে একটিও অ-মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনার নাম সামনে আসেনি। তাই এ প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক—অবৈধ স্থাপনার সংজ্ঞা কি কেবল মুসলিম স্থাপনার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?

মাদরাসা মানেই কি নিরাপত্তা হুমকি?

মাদরাসা হচ্ছে ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র। ভারতের বহু দরিদ্র মুসলিম পরিবার সেখানে সন্তানদের ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠায়। হঠাৎ করেই এত বিপুল সংখ্যক মাদরাসা ‘অবৈধ’ হয়ে গেল—এমন সিদ্ধান্ত কতখানি বাস্তবসম্মত, আর কতটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সরকারি যুক্তিতে বলা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ স্থাপনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কিন্তু এমন কোনও নিরপেক্ষ তদন্ত বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি, যাতে বোঝা যায়—এই মাদরাসাগুলোর অস্তিত্ব আসলেই এমন হুমকি তৈরি করছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ধারাবাহিক নিপীড়নের ছায়া

ভারতের ইতিহাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের ছাপ রয়েছে, বিশেষত মুসলিমদের ক্ষেত্রে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ছিল ভারতীয় রাজনীতির মোড় ঘোরানো একটি ঘটনা। এরপর গুজরাট দাঙ্গা (২০০২), এনআরসি-কাগজপত্র বিতর্ক, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), এবং হিজাব নিষেধাজ্ঞা—এই সবকিছুই মুসলিমদের এক ধরণের কোণঠাসা করার কৌশলের অংশ হিসেবে অনেকে দেখেন।

উত্তর প্রদেশে সদ্য সংঘটিত ৩০০ স্থাপনা উচ্ছেদ সেই ধারাবাহিক নিপীড়নের আরেক ধাপ কি না, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

সংবিধানের চোখে ধর্মীয় স্বাধীনতা

ভারতের সংবিধানের ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার আছে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার। তাহলে কেন মসজিদ বা মাদরাসা নির্মাণে এত বাধা? কেন একই সঙ্গে অন্য ধর্মের স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র যদি না দেয়, তবে এর দায় বহন করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—হতাশা, বিদ্বেষ আর বিভাজনের ভার নিয়ে।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও আতঙ্কের বাস্তবতা

স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় অনেক জায়গায় না জানিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, নামাজের জায়গা হারিয়ে মানুষ হতবাক। ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা—এগুলো এখন তাদের জীবনের অংশ।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ চলতে পারে, তবে সেটি যেন নিরপেক্ষ হয়, ধর্মভিত্তিক হয় না।

ভারত কি সংবিধানচ্যুতি পথে?

যদি সত্যিই অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হয়, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবে যখন দেখা যায় একপাক্ষিকভাবে কেবল মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন তা নিছক আইন প্রয়োগ থাকে না—তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বার্তা, সামাজিক বিভাজনের ইন্ধন।

ভারতের ভবিষ্যৎ কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের দিকে, নাকি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় চিন্তাধারার একনায়কত্বের দিকে—সেই প্রশ্ন এখন সর্বত্র প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

তাই প্রশ্ন উঠছেই—৩০০ স্থাপনা গুঁড়িয়ে ভারত সরকার কোন পথে?

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222