রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে দলের আমীর পীর সাহেব চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, “জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিলো স্বৈরাচার থেকে দেশকে মুক্ত করা, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন করা।” তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের সকল নাগরিকের মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতেই সংসদের উভয় কক্ষে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে নির্বাচন একমাত্র সমাধান।”
তিনি বলেন, “দেশের সকল নাগরিকের ভোটের সমান মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সংসদে তাদের তত শতাংশ আসন থাকতে হবে।” তিনি দাবি করেন, পিআর পদ্ধতি এখন জনগণের, সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের একবাক্যের দাবি হয়ে উঠেছে।
সংবিধান ও স্বৈরাচার প্রসঙ্গে বক্তব্য
পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, “১৯৭২ সালের সংবিধান ছিলো দেশের বোধ-বিশ্বাস ও গণআকাঙ্ক্ষার বিরোধী। ভিনদেশী ভাবনায় রচিত সংবিধান থেকেই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হয়েছে। এই সংবিধানই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি ও দুর্নীতির শিকড়।”
পতিত ফ্যাসিবাদের বিচার দাবি
তিনি বলেন, “পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যারা খুন-গুম, চাঁদাবাজি, জুলুমের সাথে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করতে হবে। যারা সহায়তাকারী ছিল, তারাও রেহাই পাবে না।”
আইন-শৃঙ্খলা ও রাজনীতি
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বরদাস্ত করা হবে না। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে।”
কৃষক-শ্রমিক-প্রবাসীদের বার্তা
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, নিরাপত্তা বাহিনী, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাই ইসলামী আন্দোলনের অঙ্গীকার।”
সংখ্যালঘু ও নারীদের আশ্বাস
তিনি বলেন, “উলামায়ে কেরামের সম্মান, নারীদের সম্মান এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য।”
অন্তর্বর্তী সরকারকে বার্তা
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের ফসল। আমরা আপনার পাশে আছি, তবে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করুন।”
১৬ দফা দাবি ঘোষণা
দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান মহাসমাবেশে ১৬ দফা দাবিসহ ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত সংস্কার কমিশনের ছয়টি প্রস্তাবনাকে আমরা মূল্যায়ন করে মতামত দিয়েছি। আজকের মহাসমাবেশ সেই অভ্যুত্থানের বর্ধিতাংশ।”
প্রধান ১৬ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে:
- সংবিধানে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন।
- সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতির নির্বাচন।
- ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা।
- মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পন্ন করা।
- লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত ও প্রশাসন ঢেলে সাজানো।
- ফ্যাসিবাদের বিচার ও পালাতকদের ফেরত আনা।
- পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের দৃশ্যমান উদ্যোগ।
- চাঁদাবাজি ও সহিংসতা দমনে প্রশাসনকে কার্যকর করা।
- ভারতের সাথে চুক্তি প্রকাশ ও দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল।
- জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন সম্পন্ন।
- দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।
- নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত।
- রাজনৈতিক হয়রানি ও মিথ্যা মামলা বন্ধ করা।
- দেশ ও ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য।
- দেশপ্রেমিক ইসলামী শক্তির ঐক্য গঠন।
- সর্বস্তরে ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠা।
বিশাল জনসমাগম
সকাল ৮টা থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। একসময় শাহবাগ, পল্টন, কাকরাইল, দোয়েল চত্বর পর্যন্ত রাস্তায় মানুষের ঢল নামে।
অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ:
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক, বোধিজ্ঞান ভাবনাকেন্দ্রের দয়াল কুমার বড়ুয়া, খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের নির্মল রোজারিওসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতারা। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, গোলাম পরওয়ার, খেলাফত মজলিসের ড. আহমাদ আব্দুল কাদের, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজী, এনসিপির আখতার হোসাইন ও সারজিস আলম, গণঅধিকার পরিষদের নূরুল হক নূর, এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রমুখ।
ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে বক্তব্য দেন সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, মহাসচিব ইউনুস আহমদ, যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, শেখ ফজলে বারী মাসউদ, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলম প্রমুখ।
সমাবেশ পরিচালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ইফতেখার তারিক এবং সহ-প্রচার সম্পাদক মাওলানা কেএম শরীয়াতুল্লাহ।
হাআমা/
