মাঠে সরব ইসলামি দলগুলো, নেই কেন দুই জমিয়ত?

by hsnalmahmud@gmail.com

হাসান আল মাহমুদ >>

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করাসহ একাধিক দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে নেমেছে সাতটি ইসলামপন্থী দল। ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায়, ১৯ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় শহরে এবং ২৬ সেপ্টেম্বর সারাদেশের জেলা ও উপজেলায় পালিত বিক্ষোভ-মিছিলে তারা সরকারকে চাপ সৃষ্টি করে লিখিত ও আইনি উদ্যোগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে বলেছে। তবে এই দাবিতে মাঠে সরব থাকা দলগুলোকে মোটেও একমত করছেন না বিভক্ত দুই জমিয়ত — তারা কোথায় এবং কেন নেই তা নিয়েও বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত দলসমূহ হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন

মূল দাবিসমূহ (সংক্ষিপ্ত)

১. জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন।
২. নির্বাচন পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে হওয়া।
৩. সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।
৪. জুলাই–শাপলা ও অন্য গণহত্যার বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি করা।
৫. ফ্যাসিবাদ ও জাতীয় পার্টিসহ তাদের সহযোগীদের বিচার নিশ্চিত এবং তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ/নিষিদ্ধ করা।
৬. দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করা।

কর্মসূচি ও কর্মপরিকল্পনা

দলগুলো জানিয়েছে—প্রথম ধাপে ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ, ১৯ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় কেন্দ্রগুলোতে বিক্ষোভগুলো এবং ২৬ সেপ্টেম্বর জেলা ও উপজেলায় বিক্ষোভ-মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় শাখাগুলোও একই দিনে (২৬ সেপ্টেম্বর) ব্যাপক কর্মসূচি execution করেছে। বহু জেলায় একই সাথে মিছিল ও সমাবেশ পালিত হয় এবং এতে শতাধিক উপজেলায় জনসমাবেশ ও মিছিল হয়েছে।

আজ শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশের একাংশ চিত্র

নেতাদের বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি

জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “প্রতিটি কর্মসূচি জনগণের দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা সরকারের কাছে কার্যকর প্রতিশ্রুতি চাইছি।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই) বলেন, “জুলাইতে জীবন বাজি রেখে যারা সংগ্রাম করেছে, আমরা তাদের রক্ত ও ত্যাগ স্বীকার করতে পারব না—সুতরাং প্রত্যাশা বাস্তবায়নের জন্য রাজপথে নামতে বাধ্য হচ্ছি।” তিনি দাবির লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন, জুলাই সনদের প্রত্যাশিত আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার না হলে তাদের ধৈর্য হারাবে।

খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “জুলাই সনদকে সংসদের উপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে ক্ষমতায় গেলে প্রতিশ্রুতি ভূলে যাওয়ার প্রবণতা আছে। সুতরাং অধ্যাদেশ, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ঘোষণা বা অন্য কার্যকর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সনদ কার্যকর করতে হবে।” তিনি সনদভিত্তিক ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—“সরকার যদি স্পষ্ট উদ্যোগ না নেয়, পরবর্তীতে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম মুরাদনগর সমাবেশে বলেন, “সংস্কার ও বিচারের অঙ্গিকার পূরণ না হলে আমরা একই পদ্ধতির নির্বাচনে ফিরব না; পিআর ছাড়া গ্রহণযোগ্য উচ্চকক্ষ হবে না।” তিনি প্রয়োজনে নির্বাচন ফেব্রুয়ারি নয়, ডিসেম্বরেও করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন—তবে আগে সংস্কার ও বিচার নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

নেজামে ইসলাম পার্টি মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার রাজধানীর পুরানা পল্টনে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “এসব দাবি কেবল রাজনৈতিক নয়; জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতার স্বার্থে আমরা এগুলো উপস্থাপন করছি।”

নেজামে ইসলাম পার্টির পৃথক পাঁচ দফা

নেজামে ইসলাম পার্টি আলাদাভাবে পাঁচ দফা দাবি করেছে—(১) জুলাই সনদের আইনিভিত্তি প্রদান, (২) জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের সহযোগীদের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ, (৩) জুলাই ও শাপলা সহ সকল গণহত্যায় দায়ীদের বিচারের নিশ্চয়তা, (৪) গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টিকরণ, (৫) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ। তারা এ দাবির বাস্তবায়নে ১৮, ১৯ ও ২৬ সেপ্টেম্বর কর্মসূচি দিয়েছিল।

এদিকে আজ শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠে সরব থেকেছে জামায়াতে ইসলামি, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস।

২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার খেলাফত মজলিসের উদ্যোগে পরিচালিত কর্মসূচি সহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শাখায় বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন থানায়—ভাটারা থানা, গাজিপুর জেলা ও মহানগর, দোহারে ঢাকা জেলা দক্ষিন শাখা, সাভারে ঢাকা জেলা উত্তর শাখা—সহ মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নড়াইল, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, নাটোর, লক্ষীপুর, ভোলা, গাইবান্ধা ইত্যাদি জেলায় বড় মিছিলে অংশগ্রহণ ও স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুহসিনুল হাসানের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নড়াইল, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, চুয়াডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, নাটোর, লক্ষীপুর, ভোলা, গাইবান্ধা সহ প্রায় সব জেলায় কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরীর নেতৃত্বে জগন্নাথপুর, বাঞ্ছারামপুর, পলাশবাড়ী, সিলেট মহানগরের ৭নং ওয়ার্ড, বদরগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, গোলাপগঞ্জ, জাজিরা, বিয়ানীবাজারসহ শতাধিক উপজেলায় কর্মসূচি হয়েছে।

প্রতিনিধিরা বলছেন, মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন—‘সময় থাকতে সরকার জনগণের দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে জনতার আন্দোলনের স্রোত সব অপশক্তিকে ভাসিয়ে দেবে।” বক্তারা দাবি করেছেন, “জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া জনগণ ঘরে ফিরবে না।’

কেন মাঠে নেই দুই জমিয়ত?

যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অন্যান্য দলগুলোকে দেখে প্রশ্ন উঠেছে—বিভক্ত দুই জমিয়ত (জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ—আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রহ.) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ—মুফতি ওয়াক্কাস (রহ.) শাখা) কেন মাঠে নেই। দুই জমিয়তের অবস্থান ও ব্যাখ্যা জানতে আজ শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধায় কথা হয় দল দুটোর মহাসচিবের সঙ্গে।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী) এর মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হল সংবিধান সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আগামী সংসদের উপর ন্যস্ত করা এবং যেগুলো সংবিধান রিলেটেড নয়, সেগুলো অধ্যাদেশ জারি করে কার্যকর করা যেতে পারে। আমরা জুলাই সনদের ব্যাপারে আন্তরিক; যদি সব দল ১০৬ অনুচ্ছেদ আলোকে একমত হয়, তাহলে আমরা সনদ বাস্তবায়নে একমত হতে রাজি।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (মুফতি ওয়াক্কাস) এর মহাসচিব ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম বলেন, ‘জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নির্বাচিত সরকারই প্রদান করবে; সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধির ভোটেই সনদ পাস হবে। এটা শুধুমাত্র আমাদের মত নয়—বিএনপির সঙ্গে থাকা ৩৬টি দলও একই মত প্রকাশ করেছে।’

দুটি জমিয়তের এ অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে তারা সংবিধান-সংক্রান্ত পরিবর্তন ও সনদের ‘আইনি ভিত্তি’ সংক্রান্ত বিষয়ে পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়াকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। খণ্ডসংকটে তারা সরাসরি রাজপথে না এসে সংবিধানগত প্রক্রিয়ায় এগোনোর পক্ষে মত দিয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, ইসলামি দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলন নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী সংকেত; তারা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে বলছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—এ ধরনের ব্যাপক কর্মসূচি রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।

কয়েকজন বক্তা সতর্ক করেন—‘জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে এবং এর দায়ভার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই বহন করতে হবে।’

আন্দোলনকারীরা বলেছেন, সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে পরবর্তী সময় আরো বড় কর্মসূচি নেয়ার হুঁশিয়ারি আছে।

এছাড়া, আজ শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের পক্ষে থেকে পিআর নিয়ে বারবার সংস্কার কমিশনকে আলোচনা পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হলেও সংস্কার কমিশন বারবার জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করার কারনেই রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি।’

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222