হাসান আল মাহমুদ >>
ক্ষমতায় গেলে কওমি শিক্ষা সিলেবাস পরিমার্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির এই ঘোষণাকে ঘিরে কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট মহলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এই ঘোষণার কড়া সমালোচনা করছেন, আবার নির্বাচনী ঐক্যে থাকা কয়েকটি দলের নেতা-কর্মী ও কওমি সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। ইশতেহারে বলা হয়, জামায়াত সরকার গঠন করলে ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো সরকারি করা হবে এবং কওমি শিক্ষা সিলেবাস পরিমার্জন করা হবে। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার এক লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
এই ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন অনেকেই ঘোষণাটিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাদের বক্তব্য, জামায়াত অতীতে কখনো কওমি মাদরাসার মঙ্গল চায়নি; বরং কওমি শিক্ষার বিকাশে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির সঙ্গে সরকারে থাকার সময় কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়নেও দলটি প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল বলে অভিযোগ তাদের। সমালোচকদের আশঙ্কা, ক্ষমতায় গেলে জামায়াত কওমি মাদরাসাকে সংকুচিত করে এর স্বকীয় শিক্ষাধারা বিকৃত করার চেষ্টা চালাতে পারে।
এদিকে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যে থাকা কয়েকটি দলের নেতা ও কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সময়ের প্রয়োজনে কওমি মাদরাসার সিলেবাসে পরিমার্জন দরকার—এ দাবি ভেতর থেকেই উঠে আসছে। তারা বলেন, জামায়াত নিজে থেকে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলেনি; বরং কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ আলেম ও আকাবিরদের সঙ্গে পরামর্শ করেই বিষয়টি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে।
তবে কওমি আলেম সমাজের বড় একটি অংশ এই ঘোষণাকে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। কওমির বিশিষ্ট আলেম মুফতী সাখাওয়াত হুসাইন রাজী বলেন, কওমি মাদরাসার সিলেবাস পরিমার্জনের ঘোষণা কওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। অতীতেও কোনো সরকারকে এই পথে অগ্রসর হতে দেওয়া হয়নি, ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না—ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, কওমি মাদরাসা পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র বোর্ড বিদ্যমান, যেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম দায়িত্বশীলভাবে যুক্ত রয়েছেন। সময় ও প্রয়োজনের আলোকে পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন তারা নিজেরাই সুচিন্তিতভাবে করে আসছেন। এখানে সরকারের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই, অধিকারও নেই।
আলিয়া মাদরাসার উদাহরণ টেনে মুফতী সাখাওয়াত হুসাইন রাজী বলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানে দ্বীনি শিক্ষার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কওমি মাদরাসার দিকে আঙুল তোলা দ্বীনি শিক্ষার শেষ স্বাধীন দুর্গকে দুর্বল করার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া।
তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদরাসার সিলেবাস সংস্কারের ঘোষণা গভীর উদ্বেগজনক এবং এটি কওমি মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয় বিনষ্ট করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রাথমিক ইঙ্গিত।
তিনি বলেন, কওমি মাদরাসা কোনো রাষ্ট্রনির্ভর বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা নয়। দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতির আলোকে এটি কওম ও উলামায়ে কেরামের হাতে গড়ে ওঠা একটি স্বাধীন দ্বীনি শিক্ষাধারা। দেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন বোর্ডের মাধ্যমে যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ্যক্রমে পরিমার্জন দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে।
আলিয়া মাদরাসার বর্তমান পরিস্থিতিকে জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে সেখানে দ্বীনি শিক্ষার গভীরতা ও স্বাতন্ত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই কওমি মাদরাসার সিলেবাস সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কওমি আলেমদের মতে, কওমি মাদরাসা দারুল উলুম দেওবন্দের আট মূলনীতির আলোকে পরিচালিত হওয়ার কারণেই রাষ্ট্রীয় চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে টিকে আছে। এই মূলনীতিগুলোই কওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। তাদের আশঙ্কা, পাঠ্যক্রম পরিমার্জনের নামে কওমি মাদরাসার ওপর রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চাপানো হলে খালেস দ্বীনি শিক্ষার স্বাধীন ধারাটি চরম হুমকির মুখে পড়বে।
এদিকে জামায়াতের ঘোষণাকে ঘিরে বিতর্ক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে কওমি শিক্ষা নিয়ে দলটির এই অবস্থান আগামী দিনে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে আরও আলোচনার জন্ম দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাআমা/
