দেশের চলমান জ্বালানি তেল ও গ্যাসসহ যে কোনো সংকট উত্তরণে বিরোধী দলের আলোচনার প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশকে এগিয়ে নিতে সবাই মিলে কাজ করার জন্য আমরা প্রস্তুত। গতকাল বুধবার রাতে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমানের আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ নেতা এ কথা বলেন। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা, জ্বালানিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক সংসদ সদস্য আলোচনায় অংশ নেন।
সংসদে আনা নোটিশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বর্তমানে সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মানুষ জ্বালানি পাচ্ছে না, যার ফলে জনজীবনে বহুমাত্রিক সংকট দেখা যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলোÑ সারাদেশে যখন জ্বালানির জন্য হাহাকার চলছে, তখন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংকটের কথা অস্বীকার করে বিভ্রান্তিকর দাবি জানাচ্ছেন। সরকারের এই বাস্তবতাবিবর্জিত ও অস্বীকারের প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তাই বর্তমান সংকটের প্রকৃত তথ্য প্রকাশপূর্বক এ সংকট নিরসনে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সমাধান জরুরি।’
নোটিশের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিশ্বব্যাপী সংকট চলছে; যে কারণে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। আবার এ নিয়ে অসাধুমহলের অপতৎপরতা চলছে। তারপরও সরকারের পদক্ষেপে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরেছে। সরকার জনগণের স্বার্থে ও কৃষকের ভর্তুকি নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। এরপরও জ্বালানি সংকট নিরসনে কোনো সুপারিশ থাকলে তা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও তার টিমকে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর দপ্তরে আলোচনার আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বর্তমানে জ্বালানি তেলের যে পরিস্থিতি বিরাজ করছেÑ সেটাকে ‘সংকট’ বলতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি এটাকে সংকট বলতে চাই না। বিরোধীদলীয় নেতা দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের কথা বলেছেন, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, জ্বালানির কারণে কি বোরো চাষ ব্যাহত হয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সহনীয় মাত্রায় জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। যদি সংকটই হতো, তবে কি কোনো মিল-ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়েছে? চাষাবাদ, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্যÑ সবকিছুই তো স্বাভাবিকভাবে চলছে। তাহলে সংকট কোথায়?’
জ্বালানি তেলের কালোবাজারি ও মজুত প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোথাও কালোবাজারি বা মজুত হলে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোই (র্যাব, পুলিশ, বিজিবি) খুঁজে বের করছে। অনলাইনে তেল বিক্রির কালোবাজারি চক্রকেও ধরা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিন-রাত মাঠপর্যায়ে কাজ করছে এবং প্রতিটি ডিপো ও পাম্পে রুটিনমাফিক তদারকি করা হচ্ছে।
সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বর্ডার এলাকায় দাম কম থাকলে কিছু পাচারের প্রবণতা থাকে। তবে সরকার সফলভাবে জ্বালানি তেল বা সিলিন্ডার পাচার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কৃতিত্ব অনেকে স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু আমরা সফলভাবে পাচার ঠেকিয়ে দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা যে পুলিশ কাঠামো পেয়েছি, তাকে রাতারাতি পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়। তবে আমরা তাদের মোরালি স্ট্রং (মানসিকভাবে শক্তিশালী) করছি এবং জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছি। বাংলাদেশে আর কোনো ‘মব কালচার’ থাকবে না। অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব না হলেও আমরা একটি নজির স্থাপন করতে চাই।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে চলেছি। আগামী শনিবারও এরকম একটি বৈঠকের দিন নির্ধারিত রয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যেকের বুদ্ধি নিচ্ছি, পরামর্শ নিচ্ছি। পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল পাস আমরা চালু করেছি ঢাকায়, যেটি সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি প্রত্যেকটা জেলা শহরে কিন্তু জ্বালানির ব্যবস্থাপনার চিত্র অনেক উন্নত হয়েছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের এলাকায় ফুয়েল পাস চালু করে এই ব্যাপারে সুফল লাভ করেছে। আমি নিশ্চিত আগামী শুক্র-শনিবারে আমরা অধিকাংশ নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ফেরত যাব। এলাকায় ফিরে গিয়ে আমরা জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে বাস্তব চিত্র সম্পর্কে যদি পরামর্শ দেই নিশ্চয়ই আগামী সপ্তাহে এই চিত্র আরও পাল্টাবে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ ও পাচারের চেষ্টা চলছে। কোথাও পানির ট্যাংকে, কোথাও ড্রয়িংরুমে, আবার কোথাও মাটির নিচে ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুদের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি কাভার্ড ভ্যান ও অ্যাম্বুলেন্সে করেও তেল পাচার করা হচ্ছে। এসব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সরকার ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে এবং এটি পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরেছে।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে চলমান জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে পড়ে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে ৩ জন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে দুই-চার লিটার সংগ্রহ করতে এসে হিটস্ট্রোক করে ৩ জন কৃষক মারা গেছেন। মানুষ দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করছে। আমি নিজে দেখেছি, ৫ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে। যারা দিনে ১৫০০-২০০০ টাকা রুজি করতেন, তেলের অভাবে এখন তাদের ৫০০-৭০০ টাকাও হচ্ছে না। এই গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত।’
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি সরকারি দলকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ আগে তারা বলেছিলেন জ্বালানির কোনো সংকট নেই, কিন্তু আজ ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতির চেয়ে বাস্তবমুখী ও পজিটিভ বক্তব্য এসেছে। আগের চেয়ে কিছুটা হলেও সত্য স্বীকার করা হয়েছে।’
সংসদে চরিত্র হনন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আসেন আমরা ঠেলাঠেলির রাজনীতি বন্ধ করি। একে অপরকে গালি দেওয়া বা দোষারোপ করা নয়, বরং কনস্ট্রাক্টিভ বা গঠনমূলক সমালোচনা করি।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের শর্ট টার্ম, মিড টার্ম এবং লং টার্ম স্ট্র্যাটেজি থাকতে হবে। যদি সরকারি দল মনে করে একটি কমন বা যৌথ কমিটি করা দরকার, তবে আমরা তাতে সাড়া দেব। আমাদের কাছে কিছু প্রপোজাল (প্রস্তাবনা) আছে, যা আমরা সরকারের হাতে তুলে দিতে চাই।’
বক্তব্যের শেষে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আসুন সুন্দরবনের মধু একটু আমরা ঠোঁটে লাগাই, রংপুরের ছ্যাঁকা মরিচের কথা ভুলে যাই। আমরা সবাই মিলে দেশের জন্য ভালো কিছু করে যেতে চাই। যেন তৃপ্তি নিয়ে মরতে পারি যে, এই জাতির জন্য কিছু একটা করতে পেরেছি।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা বলেন, আমি প্রথমেই বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিরোধীদলীয় সব সংসদ সদস্যবৃন্দকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আমরা এতক্ষণ এখানে আলোচনা করলাম অবশ্যই যে বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবার জন্য যে বিষয়টি বিরোধীদলীয় নেতা উপস্থাপন করেছেন এখানে আজকে এই মুহূর্তে আমরা যেই সংসদে দাঁড়িয়ে আছি এই সংসদটি বহু শহীদের রক্তের ওপরে প্রতিষ্ঠিত। এই সংসদটি এই সংসদটি বাংলাদেশের মানুষের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে বাংলাদেশের মানুষের সেই আশা-আকাক্সক্ষার ওপরে প্রতিষ্ঠিত। সে জন্যই আজকে এই সংসদে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে মাত্র আলোচনা প্রায় শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। সেই বিষয়টি নিয়ে হয়তোবা আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে নিঃসন্দেহে কেউই আমরা অস্বীকার করছি না বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এই মুহূর্তে আমরা যদি বিশ্ব রাজনীতি বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্ব বাস্তবতা বিবেচনায় সমগ্র বিশ্বের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে যেভাবেই আমরা বলি না কেন, যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি সমগ্র বিশ্ব বাংলাদেশসহ প্রত্যেকটি মানুষ প্রত্যেকটি দেশ প্রত্যেকটি জাতির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে ভালো যে বিষয়টি আজকের আলোচনা সেটি একজন রাজনৈতিককর্মী হিসেবে আমি মনে করি যে, আজকের এই সংসদের প্রত্যেক সংসদ সদস্য, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল আমার মনে হয় একটি জায়গা উপনীত হয়েছি। আমাদের আর যা কিছুর ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকুক না কেন, দেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারে আমাদের কোনো মতপার্থক্য নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব সময় আমার দলের পক্ষ থেকে আমি বলতে পারি দেশ এবং দেশের মানুষের কোনো বিষয় যদি আমাদের সামনে কেউ উপস্থাপন করেন, দেশ এবং দেশের মানুষের স্বার্থের ব্যাপারে কেউ কোনো প্রস্তাবনা দেন আলোচনা করতে চান পরামর্শ দেন সুপারিশ দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সব সময় প্রস্তুত সেই বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন, সবসময় আমরা সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে, সেই প্রস্তাবে আলোচনা করতে আমরা রাজি আছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন যে আমরা বিরোধী দল সরকারি দল সবাই মিলে কেন আলোচনা করতে পারি না? আমি সংসদকে অবহিত করতে চাই সংসদ নেতা হিসেবে যে অবশ্যই আমরা বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাব। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা বসব, আমরা আলোচনা করব। আমরা উনাদের প্রস্তাব দেখব। যদি উনাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে কোনো কিছু থাকে যেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব অবশ্যই আমরা তা করব। কেন করব আমরা? কারণ আমরা যে যেই অবস্থানেই যে এই ফ্লোরে যেদিকেই বসি না কেন বাংলাদেশের মানুষ আমাদের এখানে পাঠিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। কাজেই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ যে আলোচনা করলে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা হবে। যে কাজ করলে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থরক্ষা হবে ইনশাআল্লাহ আমরা অবশ্যই সে কাজ করব।
হাআমা/
