আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-বিকেএম। সমাবেশে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা সরকারের নীতিনির্ধারণ, কূটনীতি, জ্বালানি সংকট ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয় তিন মাসব্যাপী কর্মসূচি।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির আমীরে মজলিস মাওলানা মামুনুল হক।
সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।
মাওলানা মামুনুল হক: ‘জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের শতবর্ষের ইতিহাস ধারণ করে’
সমাবেশে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাইয়ের অঙ্গীকার ছিল আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ১৯৪৭, ২০১৩ এবং ২০২৪ সালের বিজয়ের ভিত্তিতে। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব শুধু একটি আন্দোলন নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন।
তার ভাষায়, জুলাই বিপ্লব ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯২১ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৭ সালের স্বাধীন জাতিসত্তা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে।
তিনি বলেন, ‘যারা ইসলামকে ভালোবাসে, বাংলাদেশকে ভালোবাসে এবং দেশের ঐতিহ্য ধারণ করে, তারা জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে থাকতে পারে না।’
বিএনপিকে উদ্দেশ করে মামুনুল হক বলেন, “আপনারা বাংলাদেশের ৫০ বছরের রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে গাদ্দারি করে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, যদি বিএনপি গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধা দেয়, তাহলে বিশ্বের ইতিহাসে বিএনপি একমাত্র “গাদ্দার দল” হিসেবে পরিচিত হবে।
কূটনৈতিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগে কূটনৈতিক রীতি ভঙ্গ হলেও সরকার প্রতিবাদ করেনি। একই সঙ্গে ইরান থেকে আসা তেলবাহী জাহাজ বারবার আটকে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি সরকারের সমালোচনা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়েছে উল্লেখ করে মামুনুল হক বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে এর দায় সরকারকে নিতে হবে।
শফিকুর রহমান: ‘এই মঞ্চ আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদকে বরদাশত করবে না’
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এই মঞ্চে দুটি জিনিস কখনো জায়গা পাবে না—আধিপত্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদ।”
তিনি বলেন, দেশের জনগণ অতীতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এসেছে। কিন্তু যারা একসময় রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন, তাদের একটি অংশ এখন ক্ষমতায় গিয়ে সব ভুলে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘দেশ কারো বাপের নয়’—জুলাই আন্দোলনের এই স্লোগান আজও প্রাসঙ্গিক। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শত শত আলেম-ওলামা জীবন দিয়েছেন, তাদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি যুবক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে বেইমানি করবো না। তোমাদের দাবি বাস্তবায়নে অবিচল থাকবো, ইনশাআল্লাহ।’
নাহিদ ইসলাম: ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সংসদ ও রাজপথ একাকার হবে’
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ঐকমত্য কমিশন ও সংস্কারের প্রশ্নে আল্লামা মামুনুল হক সবসময় দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ষড়যন্ত্র করে তাকে সংসদে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে, তবে রাজপথে তাকে থামানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সংসদ ও রাজপথ একাকার হয়ে যাবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের মানুষ বর্তমানে জ্বালানি সংকট, চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কষ্টে আছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হলেও সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
অলি আহমদ: ‘সরকার জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসন বসিয়েছে’
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, সরকার যে কথা দিয়েছিল, তা তারা মানেনি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার প্রত্যেকটি জেলায় জেলা পরিষদে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলে দলীয় লোকজন দিয়ে পরিচালনা করছে, যা বাকশালের নমুনা।
তিনি বলেন, তারা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা চান না, বরং বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত দেখতে চান।
অলি আহমদ বলেন, বিচারপতি নিয়োগে যোগ্যতা ও পরীক্ষা ভিত্তিক পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন, যাতে বিচার ব্যবস্থা নিরপেক্ষ থাকে।
কর্মসূচি ঘোষণা
সমাবেশ শেষে মাওলানা মামুনুল হক গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তিন মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী মে, জুন ও জুলাই মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় নাগরিক সমাবেশ আয়োজন করা হবে।
এ ছাড়া আগামী ৫ আগস্ট ঢাকায় গণমিছিলের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মাওলানা আব্দুল আজীজ, মুফতি শরাফত হোসাইন, মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজি, মাওলানা শরীফ সাঈদুর রহমানসহ অন্যান্য নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ইস্যুতে চাপ বাড়লে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তিন মাসব্যাপী কর্মসূচি এবং ৫ আগস্টের গণমিছিল সামনে রেখে রাজপথের রাজনীতি আরও সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হাআমা/
