কুমিল্লায় মহিলা মাদরাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: তদন্তে নতুন মোড়, চাঞ্চল্যকর তথ্য

by hsnalmahmud@gmail.com

আব্দুল্লাহ কাসিম আজওয়াদ >>

কুমিল্লার লাকসামে ইকরা মহিলা (কওমী) মাদরাসার আবাসিক ভবনের পাঁচতলা থেকে পড়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত শিক্ষার্থী নিজেই জানালার ফাঁক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বলে মৃত্যুর আগে জানিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
banner

ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হলেও তদন্ত কমিটির দাবি, এখন পর্যন্ত মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কে সেই শিক্ষার্থী

নিহত শিক্ষার্থীর নাম সামিয়া আক্তার (১২)। সে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দায়েমছাতী ইউনিয়নের নাওগোদা গ্রামের প্রবাসী নিজাম উদ্দিনের মেয়ে। ঘটনাটি ঘটে ১৮ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৩টার দিকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়, পরে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

পরে ধানমন্ডি থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি, নেতৃত্বে মাওলানা আবুল খায়ের

ঘটনার তদন্তে কুমিল্লা জেলা কওমী মাদরাসা সংগঠনের নির্দেশে লাকসাম উপজেলা কওমী মাদরাসা সংগঠনের উদ্যোগে ১১ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান ছিলেন মাওলানা আবুল খায়ের (সভাপতি, লাকসাম থানা কওমী মাদরাসা সংগঠন)।

তদন্ত কমিটি দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে একটি রিপোর্ট জেলা কমিটির সভাপতি বরাবর জমা দিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিয়া প্রথমে ১৫ মার্চ মাদরাসায় ভর্তি হলেও আবাসিকভাবে আসে পরে।

  • ৮ এপ্রিল সামিয়াকে তার মা মাদরাসায় রেখে যান
  • ১০ এপ্রিল মা আবার তাকে বাড়ি নিয়ে যান
  • ১৩ এপ্রিল খালা ও বড় বোন সামিয়াকে আবাসিকভাবে মাদরাসায় রেখে যান

তদন্ত প্রতিবেদনের দাবি, সামিয়া শুরু থেকেই আবাসিকে থাকতে অনিচ্ছুক ছিল। সহপাঠীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদরাসায় আনার সময় তাকে জোরপূর্বক রেখে যাওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

‘পালাতে গিয়ে পড়ে গেছি’—মৃত্যুর আগে বক্তব্য

তদন্ত কমিটি জানায়, ১৭ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে খাবার শেষে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সামিয়াও ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর ১৮ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তাকে ভবনের নিচে রাস্তার ওপর আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কান্নার শব্দ শুনে পাশের ভবনের গেটপ্রহরী শামছুল হক বের হয়ে যান। পরে মমতাময়ী হাসপাতালের স্টাফ নূরুল আলমকে সঙ্গে নিয়ে সামিয়ার কাছে যান।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন সামিয়া জানায়, ‘আমি এই ভবনের পাঁচতলার জানালার ফাঁক দিয়ে পালাইতে গিয়ে পড়ে গেছি।’

পরে প্রিন্সিপাল/মুহতামিমকে ফোনে খবর দিলে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষকদের সহায়তায় সামিয়াকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

চিকিৎসা কোথায় কোথায় হয়েছে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী—

  • প্রথমে নেওয়া হয় ইউনাইটেড হাসপাতালে, তবে সেখানে ডাক্তার না থাকায়
  • পরে তাকে নেওয়া হয় আমেনা মেডিকেল সেন্টারে
  • সেখান থেকে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়
  • পরে পরিবারের ইচ্ছায় উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় পপুলার হাসপাতালে
  • সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সামিয়ার মৃত্যু হয়
  • মৃত্যুর পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়।
  • তদন্ত প্রতিবেদনের রিপোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

‘অভিভাবকের মারধরের চিহ্ন দেখিয়েছিল’—সহপাঠীদের বক্তব্য

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৩ এপ্রিল মাদরাসায় আনার সময় সামিয়া আবাসিকে থাকতে না চাইলে তার খালা ও বড় বোন সহপাঠীদের সামনে তাকে মারধর করে জোরপূর্বক রেখে যান।

কমিটির দাবি, সহপাঠীদের কাছে সামিয়া বলেছিল, বাড়ি থেকে মাদরাসায় আসতে না চাইলে তার মা তাকে মারধর করেছেন এবং শরীরে আঘাতের চিহ্নও দেখিয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজে বক্তব্যের উল্লেখ

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সামিয়ার মামা নাছির উদ্দিন ও চাচা সাইদুল হক সৈকত মৃত্যুর দিন মাগরিবের পর লাকসাম থানা থেকে আগত তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান—সামিয়া তাদের বলেছে, সে জানালার ফাঁক দিয়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেছে।

কমিটি জানায়, এই বক্তব্য মাদরাসার অফিসের সিসিটিভি ফুটেজেও পাওয়া গেছে।

জানালার গ্রীল ভাঙা ছিল আগে থেকেই

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ভবনের জানালার গ্রীলের একটি রড আগে থেকেই কাটা ছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে থাই গ্লাস মেরামতের সময় এক মিস্ত্রি কাজের সুবিধার্থে গ্রীলের একটি রড কেটে ফেলেন। বিষয়টি ভবন মালিকপক্ষ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

মাদরাসা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে যা বলা হয়েছে
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিয়ার চিকিৎসার ব্যয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বহন করেছে। জানাজায় অংশ নিতে মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও স্থানীয় অনেক আলেম নাওগোদা গ্রামে গেলেও পরিবার ও স্থানীয় লোকজন তাদের জানাজায় অংশ নিতে বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দেয় বলে দাবি করা হয়।

দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ

তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ভবনের অবকাঠামো উন্নয়ন
  • পর্যাপ্ত দরজা-জানালা নিশ্চিত করা
  • নিয়মিত ছাত্রীদের মোটিভেশন প্রোগ্রাম চালু
  • অভিভাবকের কাছ থেকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অনাপত্তিপত্র নেওয়া
  • শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মাসিক সচেতনতা প্রশিক্ষণ
  • দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত থানা ও প্রশাসনকে জানানো
  • ছাত্রীদের বিনোদনের ব্যবস্থা
  • পুরো মাদরাসাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা

মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফীর মন্তব্য

এদিকে, ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‌‌‘অপরাধ ও অপরাধীর সঙ্গে কোনো আপস হতে পারে না। তদন্তে কেউ অপরাধী প্রমাণিত হলে তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু গণমাধ্যম ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বিষয়টি নিশ্চিতভাবে ‘হুজুরেরা ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে’—এমনভাবে প্রচার করছেন, যা এখন পর্যন্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ ও মেডিকেল টিম বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও মাদরাসা সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়নি। এমনকি শিক্ষকদের ডিএনএ টেস্টও করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রশাসনের তদন্ত চলমান

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় দায়ীদের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

এ ঘটনায় সামিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত রিপোর্টের দিকেই নজর রাখছে সংশ্লিষ্টরা।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222