৩৬ নিউজ ডেস্ক :: শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস তারাংজাই রহ. ছিলেন বিখ্যাত আলেম ও রাজনীতিবিদ। ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের ব্যক্তিত্ব কেবল একটি অঞ্চল বা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তারা হয়ে ওঠেন একটি আদর্শ, একটি চিন্তাধারা ও একটি নৈতিক শক্তির প্রতীক। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রখ্যাত আলেম, শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস তারাংজাই রহ. ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর শাহাদাত শুধু একজন আলেমের বিদায় নয়; বরং ইলম, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
মঙ্গলবার (৫ মে) চারসাদ্দার উসমানজাই এলাকায় সংঘটিত এক মর্মান্তিক বন্দুক হামলায় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এ সংবাদ মুহূর্তেই পাকিস্তানের ধর্মীয় অঙ্গনকে শোকাচ্ছন্ন করে তোলে। কারণ, তিনি শুধু একজন মুহাদ্দিস বা শিক্ষক ছিলেন না; বরং ছিলেন হাজারো ছাত্র, আলেম ও সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অভিভাবক।
মাওলানা ইদরিস তারাংজাই ১৯৬১ সালে চারসাদ্দার তারাংজাই অঞ্চলের এক প্রখ্যাত ইলমি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দ্বীনি শিক্ষা, দাওয়াত ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারা অব্যাহত ছিল। তাঁর পিতা মাওলানা হাকিম আবদুল হক ‘মুনাজিরে ইসলাম’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। দাদা শাইখুল হাদিস মুফতি শাহজাদা ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের কৃতী আলেম। পরদাদা মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাইলও নিজ এলাকায় একজন প্রভাবশালী দীনি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে ইলম ও আখলাক ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ।
শিক্ষাজীবনে তিনি অসাধারণ মেধা ও গভীর মনোযোগের পরিচয় দেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি দারুল উলুম হাক্কানিয়ায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ও ইসলামিয়াতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—ইলমকে কেবল পুস্তকগত জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করা।
মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে জামিয়া নোমানিয়া উসমানজাইয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা হয়। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিজি ও মুওয়াত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ হাদিসগ্রন্থ পাঠদান করেন। বিশেষত দারুল উলুম হাক্কানিয়ায় তাঁর দরসে অংশ নেওয়া হাজারো ছাত্র আজ পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীনি খেদমতে নিয়োজিত।
তাঁর শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল কোমলতা ও প্রজ্ঞা। তিনি কঠোরতার পরিবর্তে ভালোবাসা দিয়ে ছাত্রদের হৃদয় জয় করতেন। তাঁর দরস ছিল শুধু পাঠদান নয়; বরং চরিত্রগঠন, আখলাক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য মজলিস। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন আলেমের দায়িত্ব শুধু মাসআলা শেখানো নয়; বরং সমাজে ভারসাম্য, সহনশীলতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও মার্জিত। মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো শত্রুতা বা বিদ্বেষের ভাষা ব্যবহার করতেন না। তাঁর কথাবার্তায় ছিল সংযম, আচরণে ছিল নম্রতা এবং সিদ্ধান্তে ছিল গভীর দূরদর্শিতা। আধুনিক সময়ে যখন উগ্রতা ও বিভাজন সমাজকে ক্রমেই অস্থির করে তুলছে, তখন মাওলানা ইদরিস রহ.-এর মতো আলেমরা ছিলেন সমাজে স্থিরতা ও ভারসাম্যের প্রতীক।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ২০০২ সালে তিনি প্রাদেশিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (ফ)-এর কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শূরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাজনীতির উত্তাপ তাঁর ব্যক্তিত্বকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। তিনি সবসময় সংলাপ, প্রজ্ঞা ও নীতির রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন।
তাঁর শাহাদাতের ঘটনাটি পাকিস্তানের সামাজিক বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। একজন সম্মানিত আলেম, যিনি সারাজীবন ইলম, শান্তি ও সমাজসংস্কারের কাজ করেছেন, তাকেও যদি সহিংসতার শিকার হতে হয়—তাহলে সমাজ কোন পথে এগোচ্ছে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
আজ মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস তারাংজাই রহ. আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর ইলম, তাঁর ছাত্র, তাঁর দরস এবং তাঁর আদর্শ এখনো জীবন্ত। প্রকৃত আলেমরা কখনো মৃত্যুবরণ করেন না; তারা তাদের জ্ঞান, চরিত্র ও অবদানের মাধ্যমে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস তারাংজাই রহ.-কে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া ইলমি ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে উম্মাহর জন্য কল্যাণের মাধ্যম বানান। আমিন।
[পাকিস্তানের বিখ্যাত সাময়িকী আল-জামিয়াহর সম্পাদক মুহাম্মদ জাহিদ শাহর লেখাটি উর্দু থেকে অনূদিত]
