ইখতিলাফের আদব : চিন্তার সংকট ও সমাধানের পথ

লাবীব আব্দুল্লাহ

by Masudul Kadir

আমাদের সমাজে আজ ইসলাম নয়, বরং নিজ নিজ মাসলাক ও মাশরাব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে তাকফীর, তাফসীক, তাদলীল ও তাবদীঈর ফতোয়া দিতে আমরা মোটেও কুণ্ঠাবোধ করি না। বিরোধী মত মানেই গোমরাহী এই মানসিকতা আমাদের মনে এত গভীরে প্রোথিত যে তা কথার সীমা ছাড়িয়ে আমাদের আচরণ ও কার্যক্রমেও প্রতিফলিত হয়।

বিভক্তির বিষাক্ত স্লোগান : আজ আমাদের মুখে মুখে শোনা যায়— “শিয়া কাফের!” “বেরলবী বেদআতি ও মুশরিক!” “দেওবন্দীরা গুস্তাখে রাসূল!”

বিজ্ঞাপন
banner

“গায়রে মুকাল্লিদরা ইহুদি এজেন্ট, আহলে হাদীসরা ইংরেজদের দালাল!”

তথাকথিত ‘মাদানী’ ঘরানার লোকেরা ‘আদ্দেওবন্দিয়াহ’ নামক গ্রন্থ রচনা করে আহলে হক উলামায়ে কেরামকে কাফের সাব্যস্ত করতে ব্যস্ত।

বাস্তব চ্যালেঞ্জে উদাসীনতা : পাশ্চাত্যের লাদ্বীনিয়াত, সেক্যুলারিজম ও ওরিয়েন্টালিস্টদের আগ্রাসন নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা নেই। ক্রুসেডের নতুন ঢেউ, তথ্যসন্ত্রাস, ইসলামফোবিয়া—এসব মোকাবিলায় আমাদের কোনো প্রস্তুতিও চোখে পড়ে না। শরীয়াহ আইনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাব দেওয়ার মনোবৃত্তিও আমরা হারিয়ে ফেলেছি।

আমরা নিজেদের ‘হক’ দাবি করে মসজিদ ভেঙে মসজিদ বানাই, মাদরাসা থেকে মাদরাসা আলাদা করি, ঈদগাহ সাত ভাগে বিভক্ত করি। ইসলামী রাজনীতির দলগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলি, অথচ সাম্রাজ্যবাদীরা তখন আমাদের মানচিত্র নিয়ে খেলা করে। আমরা ব্যস্ত থাকি নামাজে হাত কোথায় বাঁধতে হবে, কীভাবে ‘আমীন’ বলতে হবে এসব বিতর্কে।
মনে হয়, যেন আমাদের জীবনের একমাত্র মিশন হলো মাসলাক-মাশরাবের নামে দ্বীনি ভাইদের সঙ্গে বিরোধ করা। ‘আমরাই হক, আমরাই হক্কানিয়াতের নিশানবরদার’—এই দাবি উচ্চারণে আমরা সোচ্চার, কিন্তু বাস্তবতা কি তাই?

প্রস্তাবনা: পরিবর্তনের পথ : এই দুঃখজনক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য কওমী মাদরাসাগুলোতে ইখতিলাফের আদব ও রীতি-নীতি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চালু করা অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে-

১. ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর আল-ইনসাফ
২. শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা (হাফিযাহুল্লাহ)-এর আদাবুল ইখতিলাফ ফি মাসায়িলিল ইলমি ওয়াদ্দীন
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইখতিলাফকে গালি নয়, বরং রহমত হিসেবে দেখার একটি নতুন ধারা গড়ে উঠবে। মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু তা হবে শালীনতা, সম্মান ও সুস্থতার সঙ্গে ইলম ও দীনের আলোকে।

মত বিরোধ, ভিন্ন মত অতীতেও ছিল সামনেও থাকবে। ভিন্নমতকে সহ্য করে একটি সহনশীল ও উদার সমাজ ব্যবস্থা প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের মাদ্রাসাগুলোতে ভিন্নমত চর্চার নিয়ম-কানুন বাস্তবায়ন করতে হবে। ভিন্নমত এবং তৃতীয় চিন্তা একটি ইসলামের সৌন্দর্য। আমাদের চার মাযহাব অস্তিত্ব লাভ করেছে ভিন্ন মত থেকেই। এটি ইসলামের সৌন্দর্য। প্রত্যেকের দলিল থাকবে যার যার মত আমল করবে এবং অপরকে সম্মান করবে।

“আমিই ঠিক” না বলে “আমিও ঠিক” বললে ভালো। “ই” হরফটি ব্যবহার না করে “ও” ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে।

ইগো, অনানিয়ত ও আমিত্ব বাদ দিয়ে আরও বিনয়ী হতে হবে। পরস্পরে সম্মান দিয়ে একটি সুন্দর সমাজ উপহার দিয়ে আমরা সুন্দর বাংলাদেশের নির্মাণ করতে পারি।

লেখক : পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

  • ———————————————————————————————————————–
  • ৩৬ নিউজের মতামত বিভাগে যে কেউ লিখতে পারেন। মতামত বিভাগের লেখার জন্য ৩৬ নিউজ দায়ী নয়। লেখাটি একান্তই লেখকের মতামত। বিরোধ বা ভিন্নমত থাকলে আপনি অবশ্যই আপনার যথাযথ দলিল উপস্থাপন করে মতামত জানাতে পারবেন।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222