অমর এক কবি আল মুজাহিদী। দেশবরেণ্য আলেম হযরত মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ.-এর মদিনার সামনে একদিন হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। দূর থেকে দৌড়ে গিয়ে হাত মিলালাম। তিনি ঘার ঘুরিয়ে দেখলেন। মিষ্টি হাসলেন। কত কত অনুষ্ঠানে শূন্য দশকে আল মুজাহিদী ভাইকে কাছে থেকে পেয়েছি। তিনি অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় কথা বলতেন। অন্যকে আপন করে নিতেন।
জাতীয় আধ্যাত্মিক কবিতা উৎসবেও তাকে পেয়েছি। কবি মহিউদ্দিন আকবর ভাই চিনিয়েছিলেন তাকে। কবিতা আড্ডায় তাকে আলাদা করে পরিচয় করে দিতেন। সেসময় তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। মহান কবিদের বাংলা ভাষাভাষি মানুষদের যে তালিকা, সে তালিকায় তিনি অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়ে আছেন।
আমাকে আল মুজাহিদী মুগ্ধ করেছেন ইরাকে মার্কিন হামলার সময়ে। দু হাজার সালের পর থেকেই মূলত আমি কিংবা শীলন বাংলাদেশ-এর তরুণ বন্ধুদের নিয়ে ছড়া লেখায় মন দিয়েছি। আমাদের আন্দোলনও তেমনই ছিল। ছড়ার মাধ্যমে জবাব দেওয়া। আজকাল যেমন তরুণরা নিজেদের যেকোনো জবাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্টাটাসে দিয়ে থাকে। আমরা আমাদের জবাব ছড়া লিখে দিতাম। চলতি সপ্তাহের কোথাও এটি পাঠ করে সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিতাম।
একবার একটা ছড়া লিখে দিলাম, ছড়াই তো। একটি শিশু সংগঠন পরের মাসে সাহিত্য সভায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে দেখি-আমার ছড়া দিয়ে তারা প্রচুর পরিমাণ স্টীকার তৈরি করেছে। তখনকার আন্দোলনের রূপটা এমনই ছিলো। প্রিয় কবি আল মুজাহিদী ২০০৩ সালের মার্কিনবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেমে এসেছিলেন-এটা অনেক ভালো লাগার ছিলো। তখন সাদ্দামের কত কত ছবি বিক্রি হয়েছে তা বলাবাহুল্য। ঘরে ঘরে সাদ্দামে ছবি ছিলো। মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভে প্রচুর পরিমাণ ছড়াপত্র বিক্রি হয়েছে। কবিতার ভাঁজপত্র বিক্রি হয়েছে। পুঁথি বিক্রি হয়েছে। কবিতার মাধ্যমেও যে আন্দোলনে অংশ নেওয়া যায়-তখনকার ছড়াকার-কবিগণ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম নিজেদের ঘরের গাদ্দারদের কারণে বাঁচতে পারেননি। সেই ইরাক এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আজ সেই একুশে পদকপ্রাপ্ত ইঙ্গ মার্কিন বিরোধী কবি আল মুজাহিদী আর নেই। তিনি পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
কবি আল মুজাহিদী বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কবি, গবেষক, সম্পাদক ও সাহিত্যসেবী। ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এই কবি ষাটের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। তার কবিতায় বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের গভীর অন্বেষণ ফুটে উঠেছে। মৃত্তিকার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রকৃতি, প্রেম, জাতীয় চেতনা এবং আত্মদর্শন তাঁর কাব্যজগতের প্রধান অনুষঙ্গ।
কবি আল মুজাহিদী জীবনদর্শন নিয়ে কবিতার মালা গেঁতে গিয়েছেন। অনিন্দ্য সুন্দরম তার কবিতা-
হে আমার অস্তিত্বময়তার একান্ত মৃত্তিকা, অতিমৃত্তিকা
এখানে কেবল চলমান পৃথিবীরা, পৃথিবীবাসীরা বেঁচে থাকে
আজ এই নির্বাসন থেকে ও নিঃসঙ্গতার করিডোর থেকে পাঠ করছি তোমার
আবেগ উপচে পড় কখনো বৃক্ষের বৃত্তচ্যুত পত্রালির মত হৃদয়ের ক্রোড়পত্র।
ঋতুর বৈচিত্রে তুমি বারবার লুকিয়ে উঠো
নবোদ্গাম উদ্ভিদের মতো।
(মৃত্তিকা-অতিমৃত্তিকা)
খেলা করো রাতদিন। বন্দী খাঁচার শিকলি কাটো তোমার করাত দিয়ে;
তুমি ডানা ঝাড়ানোর গান গাও শুধু।
তুমি কেন অম্ল-অণু শুষে নাও অরণ্যের শীর্ষ চূড়া থেকে? প্রকৃতির জরায়ু
যোজিত করো তুমি; সংকলিত করো ফল-মূল জংঘার আঁধার থেকে।
(ডুমুর বাগান)
আল মুজাহিদীকে বলা যায় তাকে সব্যসাচী লেখক। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। তিনি দীর্ঘ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে নতুন লেখকদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০৩ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে। শুদ্ধ কবিদের একজনকে হারালো বাংলাদেশ। আমরা যুগ যুগ তাকে মিস করবো। এমন সত্য ও সুন্দরের পূজারিকে আমরা হারিয়েছি। বিশ্বাসের পাথরে বসে লিখে গিয়েছেন বাংলাদেশের জয়োধ্বনি। আল্লাহ তাআলা কবিকে রহম করুন। আমীন।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও চেয়ারম্যান : শীলন বাংলাদেশ (শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন)
