আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে সমাজবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড দমনে নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে রাজ্য সরকার। এই লক্ষ্যে আজ সোমবার রাজ্য বিধানসভায় বহুল আলোচিত ‘জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল’ উত্থাপন করা হতে যাচ্ছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নতুন এই আইনটি কার্যকর হলে রাজ্যে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে এবং যেকোনো ধরনের সংগঠিত অপরাধ দমনে প্রশাসনিক ও পুলিশি ব্যবস্থা দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছিলেন। তিনি একাধিকবার বিভিন্ন জনসভায় ও প্রশাসনিক বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল অপরাধীদের গ্রেফতার করাই সরকারের লক্ষ্য নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হবে। বিধানসভায় বিলটি পেশের প্রাক্কালে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা সংগঠিত অপরাধমূলক কোনো কর্মকাণ্ডই বাংলার মাটিতে বরদাশত করা হবে না।
প্রস্তাবিত এই বিলে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের একটি সুনির্দিষ্ট ও বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এমন কোনো কাজ যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক বা চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে, তা সরাসরি সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য হবে। এর পাশাপাশি মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি সাধন, নাগরিকদের বৈধ ব্যবসা বা স্বাভাবিক জীবিকায় বাধা সৃষ্টি, জোরপূর্বক অন্যের সম্পত্তি দখল, সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতিসাধন এবং অবৈধ খনন, বনজ সম্পদ বা বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত যেকোনো অপরাধও এই নতুন আইনের আওতায় আনা হবে।
বিলে সমাজে কে ‘গুণ্ডা’ বা দুর্ধর্ষ অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন, তাও পরিষ্কার করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি নিজে অথবা কোনো সংঘবদ্ধ চক্র, দল বা গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে নিয়মিত সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, অন্যকে এই কাজে উৎসাহ দেন, অর্থায়ন করেন অথবা কোনোভাবে সহযোগিতা করেন, তবে তাকে এই আইনের আওতায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা যাবে। এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা, মাদক চোরাচালান, বিপজ্জনক বিস্ফোরক কিংবা মানবপাচারসংক্রান্ত জঘন্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও এই আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা যাবে। একই সঙ্গে সমাজের জন্য বিপজ্জনক ও অতি দুর্ধর্ষ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরাও এর প্রত্যক্ষ আওতায় পড়বেন।
নতুন এই আইনের আওতায় অপরাধীদের আটকের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো সন্দেহভাজন বা চিহ্নিত ব্যক্তিকে আটক করতে হলে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) বা তার চেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বিলে আরও বিধান রাখা হয়েছে যে, গত সাত বছরের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যদি অন্তত একবার কোনো অপরাধে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকেন অথবা একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন অন্তত তিনটি পৃথক মামলায় পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি হন, তবে তাকে এই আইনে আটক করা যাবে।
বিল অনুযায়ী, আটকের পর সম্পূর্ণ বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা হবে। এই বোর্ড প্রয়োজনে অতিরিক্ত তথ্য বা নথি তলব করতে পারবে এবং আটক ব্যক্তি চাইলে বোর্ডের সামনে নিজের বক্তব্যও উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন। এই আইনের অধীনে আনা সমস্ত অপরাধকে জামিন অযোগ্য এবং সরাসরি পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তা ছাড়া কোনো অভিযুক্ত অপরাধীকে আশ্রয় দিলে বা লুকিয়ে রাখতে সহায়তা করলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, গুজরাট ও উত্তরপ্রদেশের মতো কঠোর আইনি কাঠামোর আদলে পশ্চিমবঙ্গেও এই নতুন আইনের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিদ্যমান পুরনো আইনেও কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার প্রস্তাব আজ বিধানসভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে সরকারের এই কঠোর বিলের বিরোধিতা করে বিরোধী দলগুলোর একাংশ ইতিমধ্যেই তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, এই আইনটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে ব্যবহার করা হতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে বলা হয়েছে, কোনো নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে নয়, কেবল সংগঠিত অপরাধী ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড দমনেই এই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
টিএইচএ/
