বিশেষ প্রতিবেদক:: তেহরানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শনিবার (৪ জুলাই) তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
আফগান সংবাদমাধ্যম ‘হাশত-ই সুবহ ডেইলি’ মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, তেহরানের এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আমির খান মুত্তাকি আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির জানাজা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তালেবানের উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আব্দুল গনি বারাদারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ইরানে যান মুত্তাকি।
এই বৈঠকের খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশের কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, আফগানিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ।
তালেবান সরকারের সঙ্গে ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের এই সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক জানান, ‘বর্তমান বিশ্বরাজনীতি এখন আর নিছক কোনো রাজনৈতিক ‘আদর্শ’ বা ‘মতাদর্শের’ ওপর ভিত্তি করে চলে না; আদর্শের চেয়ে প্রতিটি দেশই নিজেদের ‘জাতীয় স্বার্থ’ ও ‘অর্থনৈতিক লাভ’-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। চীন, রাশিয়া, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যদি বাস্তবতার নিরিখে তালেবান সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে, তবে বাংলাদেশেরও পিছিয়ে থাকা উচিত হবে না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হলে বাংলাদেশ মূলত কয়েকটি খাতে বড় ধরনের সুবিধা পেতে পারে:
তৈরি পোশাক ও ওষুধ রপ্তানি: যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, মানসম্মত ওষুধ এবং অন্যান্য কনজিউমার গুডসের বড় ধরনের রপ্তানি বাজার তৈরি হতে পারে।
শ্রমবাজারের নতুন সুযোগ: আফগানিস্তানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশের দক্ষ ও আধা-দক্ষ প্রকৌশলী এবং নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে।
আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য: দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য সহজ হবে।
আফগানিস্তান উচ্চমানের শুকনো ও তাজা ফলমূল উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। দেশটির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি হলে বাংলাদেশ আফগান ফলের বাজার ও অন্যান্য খাত থেকে দারুণভাবে লাভবান হতে পারে:
শুকনো ফল বা ড্রাই ফ্রুটস আমদানি: আফগানিস্তানের কাঠবাদাম, পেস্তা, কিশমিশ, আখরোট, খুবানি এবং ডুমুর অত্যন্ত উন্নতমানের। সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের তাড়ানো সম্ভব হলে দেশের বাজারে এসব পুষ্টিকর পণ্যের দাম অনেক কমে আসবে।
তার্ভা ফলমূল আমদানি: আফগানিস্তানের বেদানা বা ডালিম, বিশেষ জাতের আঙুর, আপেল ও তরমুজ বিশ্বখ্যাত। উন্নত কোল্ড চেইন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার চুক্তি থাকলে এই তাজা ফলগুলো সহজে বাংলাদেশে আনা সম্ভব।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যাংকিং খাত: আফগানিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশের আইটি কোম্পানিগুলো সেখানে সফটওয়্যার ও ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অবকাঠামো তৈরিতে কাজ করার বড় চুক্তি পেতে পারে।
খনিজ সম্পদ ও সিমেন্ট শিল্প: আফগানিস্তান লিথিয়াম, তামা, লোহা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিপরীতে, দেশটির অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশের উৎপাদিত মানসম্মত সিমেন্ট ও রড রপ্তানির বিশাল সুযোগ তৈরি হবে।
দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠককে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ আফগানিস্তানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
মাসুম বিল্লাহ নামের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকীর সাথে বাংলাদেশ সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দীনের বৈঠককে আমি অত্যন্ত পজিটিভ হিসেবে দেখি। আমি চাই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও আফগানিস্তানের সরকার হিসেবে তালেবানের সাথে কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলুক। এতে যতটা না আফগানিস্তানের লাভ, তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশের লাভ হবে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিছক কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক আপত্তির কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের উচিত হবে না এত বড় একটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থেকে নিজেদের দূরে রাখা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বাংলাদেশ যদি আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে পারে, তবে তা দেশের অর্থনীতি এবং কূটনীতি উভয় ক্ষেত্রেই একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
