বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পাঠদান ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষকদের। অথচ সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই যদি ওঠে শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, তাহলে তা শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই দুঃখজনক। এমনই এক ঘটনার সাক্ষী হল বাগেরহাট সদর উপজেলার বড়শবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক সরদার একরামুল করিমের বিরুদ্ধে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের (বলৎকার) অভিযোগ উঠেছে।
পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করেন প্রধান শিক্ষক। পরে তার সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে চান তিনি। ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব এবং পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে দেখা দিশেছে নানান প্রশ্ন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে বিদ্যালয় এলাকায় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাদিকুল ইসলাম ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ উপস্থিত হন। তাঁরা প্রধান শিক্ষককে সেখান থেকে নিয়ে যান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরদার একরামুল করিমের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন এক অভিভাবক। আবেদনে শিক্ষার্থীকে বলাৎকার, ২০২৭ সালের এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ২০১২ সালে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
অভিযোগকারী সালমা আক্তার বলেন, একজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আমাদের এত কথা বলতে হচ্ছে, এটা আমাদের জন্যই লজ্জার বিষয়। একজন প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু শিখবে, ভালো পরিবেশ পাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু শিক্ষার বিষয় তো দূরের কথা, তাঁর কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, তা নিয়েই এখন আমাদের ভয় হচ্ছে। আমার ছেলে এই স্কুল থেকে পাস করেছে। আমার মেয়েও এ বছর পাস করেছে। মেয়ের উপবৃত্তির টাকা নিয়েও আমার সঙ্গে সমস্যা হয়েছে। মেয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আইডি সবকিছুই জমা দিয়েছিলাম। বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রধান শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন, আমার মেয়ের উপবৃত্তির নাম আসেনি। অথচ পরে জানতে পারি, আমার মেয়ের উপবৃত্তির টাকা তার বিকাশে আসে। আমরা চাই, স্কুলের পরিবেশ সুন্দর হোক। আমাদের সন্তানরা নিরাপদে স্কুলে আসুক, ভালোভাবে লেখাপড়া করুক। আমরা চাই না, আমাদের সন্তানরা প্রতিনিয়ত এমন সংকটের মধ্যে থাকুক। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি প্রধান শিক্ষককে দ্রুত এই স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাকে প্রথমে বলেছে আমি তোমাকে নাতির মতো করে দেখবো। তারপরে বলছে যে তুমি আমার বাসায় যাবা, বাসায় গিয়ে আমার সাথে বিভিন্ন ধরনের কাজ করবা, তোমাকে টাকা পয়সা যা লাগে আমি তাই দেবো। আমার সাথে ক্লাসে বসে অনেক ধরনের খারাপ আচরণ করছে। পরে আমাকে মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের খারাপ ছবি, নেগেটিভ ছবি, বিভিন্ন ধরনের খারাপ ভিডিও আমাকে পাঠিয়েছে। বলছে যে আমরা এগুলো করব। সমকামিতাও করবো। তখন আমি বুঝতাম না এগুলো কি। পরে আমি অন্য স্যারদের জানাইছি। স্যাররা বলেছে তার ভিতর যত নোংরামি আছে সেগুলো বের করবা। বের করে তারপরে বিষয়টা দেখব। পরে আমি তার সাথে কথা বলি। কথা বলতে বলতে সে আমাকে বিভিন্ন ধরনের ইঙ্গিত করে, খারাপ ইঙ্গিত করে। কয়েকদিন আগে আমাকে প্রশ্ন দিছে পরীক্ষার।’ কেন প্রশ্নটি দিয়েছে জবাবে তিনি বলেন, ‘দিছে তার বাসায় যাওয়ার জন্য। মানে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাকে বাসায় নিবে। বাসায় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের খারাপ কাজ করবে সেইজন্য। কতদিন আগে এই প্রশ্ন দিয়েছে জবাবে তিনি বলেন, পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রায় এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে।’
বড়বাঁশবাড়ীয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক নৃপেন্দ্রনাথ রায় বলেন, আমি ২০১৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানে যোগদান করি। যোগদানের পর থেকেই একজন অনৈতিক প্রধান শিক্ষকের অধীনে শিক্ষকতা করতে হচ্ছে। এটি আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে আসার পর থেকে তাঁর একের পর এক অনৈতিক কর্মকাণ্ড, অর্থ লেনদেন, শালীনতাবিরোধী আচরণ ও ভণ্ডামি আমরা দেখে আসছি। তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে চেয়ারে বসেন, তাই তাঁকে সম্মান করি। একদিন এই শিক্ষার্থী আমার কাছে এসে অভিযোগ দেয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর কাছে প্রধান শিক্ষকের পাঠানো মেসেজ রয়েছে। আমি তাকে বলি, শুধু মেসেজ দেখেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে না। পরে আমরা শিক্ষক-কর্মচারীরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি এবং শিক্ষার্থীকে সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বলি। এরপর ওই প্রধান শিক্ষক পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ধরনের নগ্ন ছবি পাঠাতে থাকেন এবং ভয়েস মেসেজ দেন। তিনি এমনভাবে যোগাযোগ করতেন, যাতে শিক্ষার্থীর বাবা-মা বিষয়টি জানতে না পারেন।
বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণী পড়ুয়া শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার বলেন, তার চোখের নজর অনেক খারাপ। একটা আলোচনা করছিলো যে বাচ্চাদের দুধের তৃষ্ণা লাগে কখন কখন তার মায়ের দুধ ভারী হয়ে যায়। এগুলো শুনে আমাদের এক সহপাঠী মাথা নিচু করে ছিলো। তখন স্যার বলে মাথা নীচু করেছো কেনো। মেয়েটি বলে স্যার আপনার আলোচনা পাল্টান। স্যার বলছে, আলোচনা করব যদি তোমার ভালো না লাগে তুমি ক্লাসে থেকে বের হয়ে যাও। স্যার আরো অনেক খারাপ খারাপ কথা বলে এবং আকার ইংগিত দেখায়। সে প্রশ্ন ফাঁস করে পর সে প্রশ্নের বিনিময়ে শরীর চায়। এই স্যারকে আমরা চাই না।
এ সকল বিষয়ে জানতে চাইলে বড়বাঁশবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় এর প্রধান শিক্ষক সরদার একরামুল করিম সকল ঘটনা অস্বীকার করেন।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহা: সাদিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল একটা অভিযোগ পেয়েছি। আজ আমরা সরেজমিনে এসেছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো যাচাই করা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীকে বলাৎকার, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তার এই অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী কমছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ঘটনায় লজ্জিত এবং অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। সৌজন্যে, ফেস দ্য পিপল
