জুলাইসহ দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দেশের কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অনন্য ত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। সোমবার (২০ জুলাই) সকালে রাজধানীর বিএমএ ভবন মিলনায়তনে ‘জুলাইয়ের রক্তাক্ত জুব্বা: মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদান’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ দাবি জানান। জুলাই বিপ্লবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অসীম সাহস, আত্মত্যাগ ও বীরত্বপূর্ণ অবদানকে স্মরণ করতে ‘ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স’ এই বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গত জুলাইয়ে ১৭-১৮ তারিখের দিকে যখন তীব্র দমন-পীড়নে আন্দোলন একপর্যায়ে স্তিমিত হয়ে পড়ছিল, তখন মূলত দুটি প্রধান শক্তি রাজপথে নেমে এই গণআন্দোলনের ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণ ঘটায়—একটি মাদ্রাসা শিক্ষার্থী এবং অন্যটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী। এই পলল ভূমির মানুষের অধিকার আদায়ে যুগে যুগে আমাদের ওলামায়ে কেরাম জীবন দিয়েছেন, রক্ত ও চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। গত কয়েক দশক ধরে শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জুব্বা রক্তাক্ত হয়েছে। মনে রাখবেন, এই জুব্বা কেবল ধর্মীয় পোশাক নয়, এটি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং আজাদি লড়াইয়ের অন্যতম প্রতীক। আমরা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, জুলাই আন্দোলনে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এই আত্মত্যাগকে অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও স্বীকৃতি দিতে হবে।’
সম্প্রতি দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, জুলাই নিয়ে নাকি ব্যবসা করা যাবে না। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। আমরা যখনই এই কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলতে যাই, তখনই একশ্রেণি প্রচার করছে আমরা নাকি জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করছি! জুলাইয়ের রক্ত কেউ বিক্রি করছে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে গত পঞ্চাশ বছর আওয়ামী লীগ এ দেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে; গুম, খুন ও ভয়ের রাজনীতি কায়েম করেছে এবং দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে লুটপাট করেছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এখন সেই একই চেতনার গীত বিএনপির মুখে সবচেয়ে বেশি শুনতে পাচ্ছি।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনগণের কাছে আমাদের মূল অঙ্গীকার ও আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক আমূল সংস্কার। এই মৌলিক সংস্কারের কথা বলাকেই প্রকৃত জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করা বলে। তবে দেশের আপামর জনগণ ভালো করেই জানে যে, জুলাই আন্দোলনের সুফল ও সুবিধা সবচেয়ে বেশি লুফে নিয়েছে বিএনপি। আন্দোলনের পর তারেক রহমান লন্ডন থেকে বীরদর্পে দেশে এসেছেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিলং থেকে সগৌরবে ফেরত এসেছেন। বিএনপি মূলত লাভ করেছে দায়িত্বহীন ক্ষমতা, আর আমরা জুলাইয়ের কুশীলবেরা পেয়েছিলাম ক্ষমতাহীন এক বিরাট দায়িত্ব। সংবিধান সংস্কার আদেশ যদি আপনাদের দৃষ্টিতে অবৈধই হয়, তবে সেই আদেশ প্রদানকারী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সরকার কেন কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না? প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের যারা শপথ পড়িয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না?’
অবিলম্বে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এই নির্বাচন প্রচলিত কোনো সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। গণবিপ্লবের পর জনগণের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা ও আদেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সংবিধানের কোথাও ২০২৪ সালে সাধারণ নির্বাচনের কথা স্পষ্ট ছিল না, নিয়ম অনুযায়ী ছিল ২০২৯ সালের নির্বাচনের কথা। ফলে সরকারকে এটি গুরুত্বের সাথে বুঝতে হবে যে, ৫ আগস্টের পরের ধারাবাহিকতা কেবল পুরোনো থোড়-বড়ি-খাড়া সংবিধান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না; এটিকে জুলাই বিপ্লবের শত শত শহীদের রক্তের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে মেলাতে হবে। সেই আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল রূপান্তর এবং নতুন বাংলাদেশের পথচলা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান সরকার সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে যে প্রহসনমূলক নাটক করছে, সেখান থেকে দ্রুত সরে এসে গণভোটের প্রকৃত রায় বাস্তবায়ন করুন। অন্যথায় ওলামায়ে কেরামসহ জুলাই বিপ্লবের সব বিপ্লবী শক্তিকে সাথে নিয়ে আমরা পুনরায় রাজপথে নামতে বাধ্য হব। ইতোমধ্যে আমরা অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মধ্যেই আছি, তবে আমরা চাই সংসদের ভেতরে সুস্থ আলোচনার মাধ্যমে এর একটি যৌক্তিক সমাধান আসুক।’
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে নিজেদের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মতামত তুলে ধরেন প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার, বিশিষ্ট চিন্তক মুসা আল হাফিজ, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনসহ বিভিন্ন ইসলামী ও সমমনা রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
টিএইচএ/
