পরীক্ষা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির পর শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতের পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় এমপিদের সমর্থন পাওয়ার পর আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বুধবার নয়াদিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তরে অনলাইন ভিত্তিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) আহ্বানে সমর্থকদের এক বিশাল জমায়েত দেখা গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও সময় গড়াচ্ছের সাথে সাথে তা সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক এই যুব আন্দোলন সিজেপির নেতৃত্বে পুরো ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদি পুনরায় ক্ষমতার মসনদে বসার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি তার নেতৃত্বাধীন মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় এবং ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা যন্তর-মন্তর চত্বর না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শত বাধা পেছনে ফেলে বুধবার সেখানে আরও হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থী সংহতি জানিয়ে যোগ দেন। আন্দোলনের গতিপথ নিশ্চিত করে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে সাফ জানান, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর-মন্তর থেকে আন্দোলন সরবে না। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে উল্লেখ করেন, যে দেশে জনগণ প্রশ্ন করা ভুলে গিয়েছিল এবং সরকারের সমালোচনাকে দেশদ্রোহিতা বলা হতো, আজ এই তরুণ সমাজ সেই ঝিমিয়ে পড়া দেশকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
বেশিরভাগ তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই রাজপথের আন্দোলন মঙ্গলবার ভারতীয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক সমর্থন পায়। বিরোধীরা আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে পরিস্থিতি চরম জটিল আকার ধারণ করে। কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী সোমবারের পুলিশি দমনপীড়নের জন্য কেন্দ্র সরকারকে প্রকাশ্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাহুল গান্ধীকে আটক করে দুই ঘণ্টা রাখা হলেও বুধবার লোকসভায় তিনি ও অন্যান্য বিরোধী এমপিরা কালো পোশাক পরে উপস্থিত হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। একই সাথে সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, দেশটির কোটি তরুণ ও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়লেও প্রধানমন্ত্রী মোদি রহস্যজনক নীরবতা পালন করে চলছেন।
এই আন্দোলনের নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করে জানা যায়, গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সুর্য কান্ত এক আপিল শুনানির সময় আন্দোলনরত তরুণ সমাজকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন। এতে সারা দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। পরবর্তীতে ওই মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে চিকিৎসা বিষয়ের উচ্চতর ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব এবং মোদি সরকারের কর্তৃত্ববাদী নীতির বিরোধিতাকে নিজেদের মূল এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করে সংগঠনটি। সোমবার ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই সিজেপি ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রার ডাক দিলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে, যা পরবর্তীতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় রূপ নেয়। রাজধানী দিল্লিতে বিগত ৫ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ছাত্র ও জনসমাবেশ বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
এদিকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের দায়ে দিল্লি পুলিশের তীব্র সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে বুধবার আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন ও আইনি সুরক্ষার এক পিটিশন তাৎক্ষণিক শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানান দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কাব্য জানান, পুলিশি নির্যাতনের ভয় থাকলেও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার তাগিদে রাজপথে থাকা ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। পুরো আন্দোলন যখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, তখনো মহারাষ্ট্রের মুম্বাই, বেঙ্গালুরু কিংবা গোয়াতেও হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। চাপ সামলাতে না পেরে অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, সরকার আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনয়ন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং পার্লামেন্টে খোলামেলা আলোচনা করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
টিএইচএ/
