আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বাধিনায়ক ছয়জন অভিজ্ঞ সামরিক কমান্ডারকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদে নিয়োগ দিয়েছেন। পৃথক ডিক্রির মাধ্যমে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং বাসিজ অর্গানাইজেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষা, পরিচালনাগত ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে মেহের নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে।
নিয়োগ অনুযায়ী, মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিয়ুমার্স হায়দারি জেনারেল স্টাফের উপপ্রধান হয়েছেন।
এ ছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদি পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হয়ে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার এবং মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি আইআরজিসির উপপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন।
অন্যদিকে রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ওজমাই আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার এবং হোজ্জাতোলেসলাম ওয়াল-মুসলেমিন হোসেইন তাইয়েব বাসিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
নতুন নিয়োগ পাওয়া ছয় কমান্ডারের বেশিরভাগই ইরানের তথাকথিত ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ বা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞ কমান্ডার। সামরিক অভিযান, স্টাফ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আলী আবদোল্লাহি: বহুমুখী সামরিক ক্যারিয়ারের কমান্ডার
মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর একজন প্রবীণ কমান্ডার। আইআরজিসি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী (ফারাজা), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
ইসলামি বিপ্লবের পরের বছরগুলোতে সামরিক প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন আবদোল্লাহি। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর মধ্যে রয়েছে গিলানের ১৬তম কুদস ডিভিশনের কমান্ডার, আইআরজিসি গ্রাউন্ড ফোর্সের চিফ অব স্টাফ, আইআরজিসি ইন্সপেক্টরেটের প্রধান এবং আইআরজিসি এয়ার ফোর্সের উপকমান্ডার।
পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও তিনি সমন্বয়কারী উপপ্রধান ও উপকমান্ডারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি সেমনান ও গিলানের গভর্নর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পরে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফে ফিরে এসে লজিস্টিকস, সহায়তা ও শিল্প গবেষণাবিষয়ক উপপ্রধান এবং সমন্বয়কারী উপপ্রধানের মতো পদে কাজ করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডও তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি ছিল।
এখন সর্বাধিনায়কের ডিক্রিতে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান হয়েছেন।
কিয়ুমার্স হায়দারি: স্থলবাহিনীর অভিজ্ঞ কমান্ডার
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিয়ুমার্স হায়দারি ইরানের সেনাবাহিনীর একজন প্রবীণ কমান্ডার। তার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনীতে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ৮১তম কেরমানশাহ আর্মার্ড ডিভিশনে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার সামরিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
তিনি স্থলবাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ঘাঁটির কমান্ডার, অপারেশনবিষয়ক উপপ্রধান, সমন্বয়কারী উপপ্রধান ও চিফ অব স্টাফ এবং স্থলবাহিনীর উপকমান্ডারসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৬ সালে সর্বাধিনায়কের ডিক্রিতে তাকে ইরানের সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনীর কমান্ডার করা হয়।
তার নেতৃত্বে সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইউনিটের প্রস্তুতি জোরদার, সামরিক সরঞ্জাম উন্নয়ন এবং বিভিন্ন অভিযানে স্থলবাহিনীর কার্যকর উপস্থিতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তার কর্মজীবনের অন্যতম সম্মাননা হলো প্রথম শ্রেণির ‘অর্ডার অব ফাতহ’ পদক।
এখন তাকে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের উপপ্রধান করা হয়েছে।
আহমাদ ওয়াহিদি: কুদস ফোর্স থেকে আইআরজিসির প্রধান
মেজর জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদি আইআরজিসির সুপরিচিত ও অভিজ্ঞ কমান্ডার। সামরিক, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞ আইআরজিসি সদস্যদের একজন হিসেবে পরিচিত ওয়াহিদি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।
তিনি আইআরজিসির কুদস ফোর্সের শুরুর দিকের কমান্ডারদের একজন এবং ১৯৯০-এর দশকে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন।
পরে তিনি প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী লজিস্টিকস মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। সেখানে পরিকল্পনা ও কর্মসূচিবিষয়ক উপপ্রধান এবং প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রীর মতো পদে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে তাকে প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী লজিস্টিকস মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয়। সংসদের আস্থা ভোট পাওয়ার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।
ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট এবং এক্সপিডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
এবার তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল করা হয়েছে এবং আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মোস্তফা ইজাদি: যুদ্ধকালীন কমান্ডার থেকে কৌশলগত দায়িত্বে
মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি আইআরজিসির একজন প্রবীণ কমান্ডার এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা।
যুদ্ধের সময় তিনি বিভিন্ন অপারেশনাল ও কমান্ড পদে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ শেষে সামরিক ও স্টাফ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদেও ছিলেন।
এক সময় তিনি আইআরজিসি গ্রাউন্ড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এবং দেশটির বিভিন্ন কৌশলগত কাঠামোতে কাজ করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদীয়মান হুমকি, সাইবার যুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
দীর্ঘদিনের কমান্ড ও স্টাফ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাই তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নতুন ডিক্রিতে তাকে আইআরজিসির উপপ্রধান কমান্ডার করা হয়েছে।
আলী ওজমাই: আইআরজিসি নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ কমান্ডার
রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ওজমাই আইআরজিসি নৌবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ কমান্ডার। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অপারেশনাল ও কমান্ড পর্যায়ে বহু বছর কাজ করেছেন তিনি।
এর আগে তিনি আইআরজিসি নৌবাহিনীর প্রথম অঞ্চলের উপকমান্ডার ছিলেন। পরে পঞ্চম অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি ওই অঞ্চলের কমান্ডার হন।
বহু বছর পঞ্চম অঞ্চলের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় নৌ অভিযান, ইরানের জলসীমা সুরক্ষা এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে রিয়ার অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হন এবং নতুন নিয়োগের আগে আইআরজিসি নৌবাহিনীর উপকমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এখন তাকে আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার করা হয়েছে।
হোসেইন তাইয়েব: সাবেক বাসিজ কমান্ডার ও আইআরজিসি গোয়েন্দা প্রধান
হোজ্জাতোলেসলাম ওয়াল-মুসলেমিন হোসেইন তাইয়েব আইআরজিসির একজন প্রবীণ কর্মকর্তা। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংস্কৃতিক, নিরাপত্তা, গোয়েন্দা ও বাসিজ-সংক্রান্ত বিভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে।
আইআরজিসিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন পদে কাজ করেন এবং পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তার আগের পদগুলোর মধ্যে রয়েছে আইআরজিসির গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান, আইআরজিসি ইন্টেলিজেন্স প্রোটেকশনের কমান্ডার এবং বাসিজ রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের কমান্ডার।
২০০৮ সালে তাকে বাসিজের কমান্ডার করা হয়। পরের বছর তিনি আইআরজিসি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের প্রধানের দায়িত্ব নেন।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন নিরাপত্তা ইস্যু ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলায় কাজ করেন।
২০২২ সালে তিনি আইআরজিসি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের প্রধানের পদ ছেড়ে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
এখন সর্বাধিনায়কের নতুন ডিক্রিতে তিনি আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরেছেন। তাকে বাসিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সূত্র: দ্য ন্যাশনাল নিউজ
