ভারতের উত্তর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী এবং বিশ্বখ্যাত ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের নিচে ‘শিবলিঙ্গ’ রয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত দাবি করেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘হিন্দু রক্ষা দল’। শুধু এই দাবি তুলেই ক্ষান্ত হয়নি সংগঠনটি, বরং এই দাবির প্রেক্ষিতে স্বনামধন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এসে গঙ্গাজল অর্পণ করার এক উসকানিমূলক পরিকল্পনাও প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে তারা। পিটিআইয়ের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী এই মাদ্রাসার ওপর এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ও ভিত্তিহীন দাবির কারণে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কঠোরহস্তে দমনে এবং শান্তি বজায় রাখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
উগ্রপন্থী সংগঠনটির উত্তরাখণ্ড রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় জানান যে, তাদের জাতীয় সভাপতি পিঙ্কি চৌধুরীর সরাসরি নেতৃত্বে সংগঠনের সদস্যরা উত্তরাখণ্ডের পবিত্র হরিদ্বার থেকে গঙ্গাজল সংগ্রহ করে সরাসরি দেওবন্দের উদ্দেশে পদযাত্রা বা যাত্রা শুরু করবেন। ভিডিও বার্তায় ললিত শর্মা দাবি করেন, দেওবন্দ চত্বরের নিচে প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে তারা ইতিপূর্বে সাহারানপুর জেলা প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসন তাদের দাবিতে সাড়া দিয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় তারা এবার নিজেরাই সেখানে গিয়ে জোরপূর্বক জল অর্পণের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে, এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সাহারানপুর জেলা পুলিশ। দেওবন্দের সার্কেল অফিসার অমিত কুমার সিং অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, ‘কাউকে এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অনুমতি দেওয়া হবে না। যে বা যারা শান্তি ও পরিস্থিতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও ব্যক্তিরা বেশ কিছু ঐতিহাসিক মসজিদ এবং প্রাচীন মাদ্রাসার নিচে বা স্থলাভিষিক্ত জমিতে প্রাচীন হিন্দু মন্দির থাকার অবাস্তব ও কাল্পনিক দাবি তোলার প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতে এই ধরনের দাবির জেরে সবচেয়ে আলোচিত এবং আদালতে গড়ানো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকার মধ্যে রয়েছে অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ (যা পরবর্তীতে আদালতের রায়ে রামমন্দির হিসেবে নির্ধারিত হয়), বারানসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ, মাথুরার শাহি ইদগাহ এবং মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক ভোজশালা কমপ্লেক্স বা কামাল মাওলা মসজিদ।
উল্লেখ্য, উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলায় অবস্থিত দারুল উলুম দেওবন্দ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী ইসলামিক বিদ্যাপীঠ। ১৮৬৬ সালে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতাভী ও মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহীর যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে অনুসৃত দেওবন্দি ইসলামী ধারা ও চিন্তার প্রধান আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক এই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাড়তি নজরদারি বজায় রেখেছে।
টিএইচএ/
