তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সদ্য গঠিত নতুন প্রতিরক্ষা জোটের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে চায় আঙ্কারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের দূরদর্শী ভাবনার কথা উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই উদ্যোগকে কেবল তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি আরও বাড়ানো এবং প্রয়োজনে সব দেশকেই এই সুরক্ষার ছাতার নিচে নিয়ে আসা উচিত।
এর আগে গত শুক্রবার তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে এই ঐতিহাসিক সামরিক চুক্তি।
কী আছে এই চুক্তিতে?
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মূলত এক বছর আগে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিরই একটি সম্প্রসারিত রূপ। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অনুকরণে তৈরি অনুচ্ছেদ ৫-এর আদল, যেখানে জোটের যেকোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে চুক্তির বিস্তারিত সামরিক রূপরেখা এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত করা হয়নি। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের কাছে ঠিক কী ধরনের ও কতটুকু সহায়তা চাইবে, তা পরবর্তীতে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এছাড়া, চুক্তিভুক্ত কোনো দেশে সরাসরি হামলা না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো দেশকে প্রতিপক্ষ বা হুমকি হিসেবে গণ্য করা হবে না।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আঙ্কারা ও রিয়াদ জানিয়েছে, এই চুক্তি অন্য কোনো কৌশলগত জোট বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে খর্ব করার উদ্দেশ্যে করা হয়নি। এমনকি চুক্তিটি ইরানসহ নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করেও করা হয়নি বলে স্পষ্ট করেছে তুরস্ক।
পরবর্তীতে জোটে যুক্ত হতে পারে কোন কোন দেশ?
চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিন দেশের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে যে দেশটির নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে, সেটি হলো মিসর। কায়রোকে এই জোটের এক স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদান আশা প্রকাশ করেছেন যে, কারিগরি জটিলতাগুলো কেটে গেলেই কায়রো আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যোগ দেবে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিষয়ক অধ্যাপক আলী বাকির মনে করেন, মিসর যুক্ত হলে এই জোটের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
মিসরের যোগদানের ক্ষেত্রে বাধা ও সংশয় কোথায়?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মিসরের কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ পুরোনো হলেও কায়রোর এই জোটে আসার ক্ষেত্রে কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত জটিলতা রয়েছে। থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক করিম এলগেন্ডির মতে, মিসর কেবল তখনই যোগ দিতে পারে, যদি এই চুক্তি ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সামরিক সহায়তার সম্পর্ককে বিঘ্নিত না করে এবং তাদের স্বাধীনভাবে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখে।
এছাড়া, চুক্তিটি যদি কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক জোটে রূপ নেয়, যা মিসরীয় বাহিনীকে অন্যের যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে বাধ্য করতে পারে, তবে কায়রো তাতে আপত্তি জানাতে পারে। বিশেষ করে আঙ্কারার পক্ষ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার বা লিবিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মতো ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে চায় মিসর। চ্যাথাম হাউসের আরেক গবেষক আহমেদ আবুদুহও মনে করেন, মিসর নিরাপত্তার বিষয়ে একমত হলেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা দায়বদ্ধতায় জড়াতে দ্বিধাবোধ করতে পারে।
উপসাগরীয় ও অন্যান্য দেশের সম্ভাবনা
জোটের সম্প্রসারণ নিয়ে গুঞ্জনের মধ্যে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোরও এতে যোগ দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম আল থানি আশা প্রকাশ করেছেন যে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সব সদস্য দেশই এই জোটে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও প্রথম দাবিদার হলো কাতার। এরপরেই অবস্থান করতে পারে কুয়েত। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ককেশীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে আজারবাইজান, সিরিয়া ও জর্ডান তুলনামূলক দ্রুত সময়ে এই জোটে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সবমিলিয়ে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার তাগিদে এবং নিজেদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখে ইচ্ছুক দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্লকে রূপ নিতে পারে এই নতুন জোট।
টিএইচএ/
