সংসদে Transfer of Property (Amendment) Act, 2026 তড়িঘড়ি করে পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক।
তিনি বলেছেন, আইনটি গতকাল ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার সংসদে পাস হয়েছে। জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের এই নতুন বিধানটি শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
সোমবার (৭সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার—দুটি পৃথক বিষয়। নতুন আইন যেন কোনো ওয়ারিশকে তার শরিয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ইসলামে হেবা শুধু কাগজে-কলমে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার নাম নয়; এর নিজস্ব শরয়ী কাঠামো রয়েছে। হানাফি ফিকহে ইজাব, কবুল ও কবয হেবার মৌলিক বিষয়। গ্রহীতার বাস্তব দখল ও কর্তৃত্বের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ নতুন আইনে মালিকানা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার তাঁর কাছেই রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন হলো—এখানে প্রকৃত হস্তান্তর ও কবয কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ হেবা ও সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর বর্ণনায়, তাঁর পিতা তাঁকে বিশেষ একটি দান করলে রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করেন, অন্য সন্তানদেরও কি অনুরূপ দেওয়া হয়েছে? তিনি না বললে নবী ﷺ বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’ এরপর তার পিতা সেই দান ফিরিয়ে নেন। —সহিহ বুখারি
মাওলানা মামুনুল হক আরও বলেন, হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর তা ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ ﷺ কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার হেবা ফিরিয়ে নেয়, সে ওই কুকুরের মতো, যে নিজের বমি পুনরায় খায়।’ —সহিহ বুখারি
সুতরাং হেবা ইসলামী শরিয়াহর একটি স্বতন্ত্র বিধান; এর মালিকানা, কবয, দখল এবং প্রত্যাহারের বিষয়ে শরিয়াহর সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে।
তিনি বলেন, আইনটির মধ্যে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের বিধানকে অবজ্ঞা করার দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে।
আইনটির পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইনমন্ত্রীর এ-সংক্রান্ত বক্তব্যে ইসলামী বিধান সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা কিংবা অবজ্ঞাই প্রকাশ পেয়েছে। হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মৌলিক পার্থক্য যথাযথভাবে অনুধাবন না করে মুসলিম পারিবারিক আইনসংক্রান্ত বিধান প্রণয়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সরকার বলছে নতুন বিধান সাধারণ হেবা বা মুসলিম আইনের হেবাকে প্রভাবিত করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাস্তবে এই আইন কি হেবার শরয়ী কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে না? বিশেষ করে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন, তাহলে প্রকৃত কবয, পূর্ণ মালিকানা এবং হস্তান্তরের চূড়ান্ততা নিয়ে গুরুতর শরয়ী প্রশ্ন সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, এই আইনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—হেবার নামে যেন আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজকে পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ওয়ারিশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি না হয়। একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর সম্পত্তি নির্দিষ্ট একজন উত্তরাধিকারীর নামে এমনভাবে হস্তান্তর করে দিলে, যাতে মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা কার্যত বঞ্চিত হয়, তাহলে তা ইসলামের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, সংসদে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি ওঠার পরও বিলটি দ্রুত পাস করা হয়েছে—এতে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এমন একটি আইন, যার সঙ্গে হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধানের সম্পর্ক রয়েছে, তা প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, বিএনপি তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকারে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে ইসলামবিরোধী কোনো আইন না করার অঙ্গীকারের কথাও বলা হয়েছে। তাহলে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের মতো সুস্পষ্ট শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আইন এত দ্রুত পাস করা হলো কেন?
মাওলানা মামুনুল হক Transfer of Property (Amendment) Act, 2026-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনা করে আলেম-উলামা, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানান।
তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু তার নামে হেবার শরয়ী বিধান ও আল্লাহর নির্ধারিত ফারায়েজকে দুর্বল করা যাবে না। মানুষের তৈরি কোনো আইনকে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর যেকোন ছলচাতুরীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ সকল ধর্মপ্রাণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ ।
