বিশেষ প্রতিবেদক
সম্পত্তি হস্তান্তরে ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা’ (দান) করার প্রস্তাবকে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ, বাতিল ও কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী বলে ফতোয়া দিয়েছেন মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার আমীনুত তালীম ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতীব মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো একটি চিঠির লিখিত জবাবে তিনি এ ফতোয়া প্রদান করেন। ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন একটি অপরিবর্তনীয় অকাট্য ফরয বিধান। সামাজিক বা মানবিক অজুহাত তুলে কুরআন ও হাদিস নির্ধারিত বণ্টননীতি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
নিচে প্রস্তাবনা ও ফতোয়ার মূল বিষয়বস্তু বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. প্রেক্ষিত ও প্রস্তাবনার বিবরণ
মোঃ আশিকুল ইসলাম তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সমাজব্যবস্থায় মৃত ব্যক্তির পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যা সন্তানরা নির্ধারিত অংশ (অর্ধেক বা সর্বোচ্চ দুই-তৃতীয়াংশ) পাওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ ‘আসাবা’ হিসেবে মৃতের ভাই বা দূরবর্তী আত্মীয়দের কাছে চলে যায়। বাস্তব ক্ষেত্রে দূরবর্তী এসব আত্মীয়রা পরবর্তীতে মৃতের স্ত্রী বা কন্যাদের দেখভাল করেন না। অন্যদিকে জীবদ্দশায় সাধারণ হেবা (দান) করলে পিতা-মাতা নিজের সম্পত্তির মালিকানা হারিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন।
এই সমস্যার সমাধানকল্পে তিনি ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা’ ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন—যার অধীনে দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও আয় ভোগ করবেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তি চূড়ান্তভাবে কন্যা সন্তানের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
২. ফতোয়ার মূল বক্তব্য ও শরিয়তি বিশ্লেষণ
মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার পক্ষ থেকে ফতোয়ায় স্পষ্ট করা হয় যে, প্রশ্নের আড়ালে মূলতঃ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত মিরাস বা উত্তরাধিকার আইনের ওপর অন্যায্য সমালোচনা করা হয়েছে এবং আসাবাকে (নিকটতম পুরুষ আত্মীয়) তাঁদের শরিয়তপ্রদত্ত হক থেকে বঞ্চিত করার একটি বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
ক. উত্তরাধিকার আইন অপরিবর্তনীয় ও অকাট্য ফরয
আল্লাহর নির্দেশ: পুত্রসন্তান না থাকলে এক কন্যা অর্ধেক এবং একাধিক কন্যা দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদ পাবে এবং অবশিষ্ট সম্পদ ‘আসাবা’ পাবে—এটি মানুষের তৈরি কোনো আইন নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর অপরিবর্তনীয় এবং অকাট্য বিধান। সমাজ পরিবর্তনের অজুহাতে এই ঐশী বিধান পুনর্বিবেচনা, পুনর্নিরীক্ষণ বা পরিবর্তন করার কোনো এখতিয়ার কারো নেই।
সীমা লঙ্ঘনের পরিণতি: আল্লাহর নির্ধারিত বণ্টননীতিকে
অপ্রাসঙ্গিক মনে করা বা এর বিকল্প খোঁজা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম এবং কুফরির সমতুল্য। পবিত্র কুরআনে মিরাসের বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আজাবের কথা বলা হয়েছে (সূরা নিসা: ১৩-১৪)।
খ. আসাবার অধিকার ও হাদিসের ভিত্তি
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন: “আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী নির্ধারিত অংশীদারদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করো। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকে, তা (মৃতের) নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য হবে।” (সহীহ মুসলিম: ১৬১৫)।
সাদ বিন রবী (রা.)-এর ঘটনার উদাহরণ টেনে ফতোয়ায় বলা হয়, ওহুদ যুদ্ধে তিনি শহীদ হলে আল্লাহর নির্দেশে রাসূল (সা.) তাঁর দুই কন্যাকে দুই-তৃতীয়াংশ, স্ত্রীকে এক-অষ্টমাংশ এবং অবশিষ্ট সমস্ত সম্পত্তি মৃতের ভাই (মেয়েদের চাচা)-কে প্রদান করেছিলেন।
৩. ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা’ কেন বাাাতিল?
ফতোয়ায় প্রস্তাবিত এই হেবা বাতিল হওয়ার ৪টি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে:
১. মিরাস বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য (স্পষ্ট হারাম): যে হেবার উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করা, সেই হেবা বা দান স্পষ্ট হারাম। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো উত্তরাধিকার বাতিল করে, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তার উত্তরাধিকার বাতিল করে দেন।” (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা: ৩১৬৬৮)।
২. হেবার নামে ‘অসিয়ত’ (যা ওয়ারিশের জন্য অবৈধ): নিজের জীবদ্দশায় হেবা করা অথচ মৃত্যুর পর তা কার্যকর হওয়ার শর্ত দেওয়া—এটি রূপক অর্থে হেবা হলেও মূলত ‘অসিয়ত’। আর ওয়ারিশের (উত্তরাধিকারীর) জন্য অসিয়ত করা ইসলামে সম্পূর্ণ বাতিল ও হারাম।
৩. দখল বা হস্তান্তরের অভাব (কবযা): ইসলামি শরিয়ত ও চার খলিফার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হেবা পূর্ণ হওয়ার জন্য গ্রহীতার নিকট সম্পত্তির পূর্ণ দখল (কবযা) ও মালিকানা হস্তান্তর জরুরি। নিজের কাছে দখল রেখে মৃত্যুর পর মালিক বানানোর শর্ত শরিয়ত গ্রহণ করে না।
৪. স্ববিরোধী শর্ত: হেবা মানেই তাৎক্ষণিক নগদ মালিক বানিয়ে দেওয়া। “আমি বেঁচে থাকতে আয় ভোগ করব, কিন্তু মৃত্যুর পর তুমি পাবে”—এই জাতীয় শর্ত যুক্ত হেবা আলেম ও ফকিহদের সর্বসম্মত মতে একটি অকার্যকর ও স্ববিরোধী প্রক্রিয়া।
ফতোয়ার সমাপনীতে বলা হয়, মুসলিম উত্তরাধিকার আইন একটি ইজমাসম্মত (ঐকমত্যের) ঐশী বিধান। শাসক বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আল্লাহর দেয়া আইন বাস্তবায়ন করা, বান্দার ওপর নিজস্ব তৈরি আইন চাপিয়ে দেওয়া নয়।
তাই জীবনস্বত্ব রেখে হেবার মাধ্যমে কন্যাকে শতভাগ মালিক বানিয়ে আসাবাকে বঞ্চিত করার এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ শরিয়তবিরোধী ও বাতিল। কুরআনের সতর্কবাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফতোয়াটি শেষ করা হয় যে—সরল পথ প্রকাশের পরও যারা রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করবে এবং মুসলমানদের পথের বিপরীত চলবে, তাদের পরিণতি হবে জাহান্নাম (সূরা নিসা: ১১৫)।
