বিশেষ প্রতিবেদক :: মেঘাচ্ছন্ন বৃষ্টিতে অথৈ সাগর হওয়া পথ পাড়ি দিয়ে দিতে হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। ভোর থেকেই আকাশ কালো। টানা বৃষ্টিতে হাঁটু থেকে কোথাও কোমর সমান পানি। কারও বাড়ি থেকে পরীক্ষাকেন্দ্র পাঁচ কিলোমিটার, কারও ১০ কিলোমিটার। রিকশা নেই, সিএনজি নেই, অনেক সড়কই পানির নিচে। বই-খাতা আর প্রবেশপত্র পলিথিনে মুড়িয়ে নৌকা, ট্রলার কিংবা কোমর পানি মাড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হচ্ছে অসংখ্য এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে।
কেউ পৌঁছেছে নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে, কেউ আবার পথে আটকে থেকে পরীক্ষা দিতে পারেননি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের অধিকাংশ শিক্ষা বোর্ডে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সরকারের অনড় সিদ্ধান্তে পরীক্ষা চললেও বাস্তবে অনেক পরীক্ষার্থীর জন্য কেন্দ্রে পৌঁছানো ছিল এক ধরনের যুদ্ধ। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন।
কোথাও শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে, কোথাও কোমর সমান পানি পার হয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার।
চলতি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি জেলার পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদিকে দেশের বাকি শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পরীক্ষা যথারীতি চলছে।
পরীক্ষা চালুর পক্ষে সরকার
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি দেশের চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা চালু রাখার যৌক্তিকতা স্পষ্ট করেছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড বলছে, পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখা, যথাসময়ে ফলাফল প্রকাশ, শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার ঠিক রাখা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সোমবার (২০২৬) বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির এক নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়।
নোটিশে বলা হয়, দেশের সকল শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী এবারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডার যাতে ব্যাহত না হয়, সেই চিন্তা থেকেই সরকার পরীক্ষা সচল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পরীক্ষা বারবার স্থগিত করা হলে ফলাফল প্রকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম পিছিয়ে পড়বে। এছাড়া অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থার কারণে একটি অঞ্চলের সংকটের জন্য দেশের সব বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখা বাস্তবসম্মত নয়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, দেশের অধিকাংশ পরীক্ষা কেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী রয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরীক্ষা গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান আছে।
অবহিতকরণ নোটিশে বলা হয়, অপ্রত্যাশিতভাবে আজ সোমবার সকালে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কিছু কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের যাতায়াতে সাময়িক ভোগান্তি হলেও স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়েছে।
তবে, সরকারের কাছে শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে অবহিতকরণ নোটিশে বলা হয়, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশে শুধু ওই বোর্ডের পরীক্ষা আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। একইভাবে, দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বা পরীক্ষা গ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিতের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে পরীক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানায় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।
কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামন ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, বারবার পরীক্ষা স্থগিত হলে ফল প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের স্থগিত পরীক্ষার নতুন সূচি কবে ঘোষণা হবে, তা এখনো জানানো হয়নি। একইসঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আবহাওয়ার আরও অবনতি হলে শিক্ষা প্রশাসন নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
সামাজিকমাধ্যমে নিন্দার ঝড়
বন্যা ও দুর্যোগময় আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা চালু রাখা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে অসংখ্য পোস্ট, ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, ‘একটি শিক্ষাবর্ষ কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে আপস কেন করা হবে?’
আবার কেউ কেউ বলেন, ‘রাজধানী বা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকার বাস্তবতা দিয়ে দেশের সব অঞ্চলের পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক নয়।’
সোচ্চার রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়িয়ে বন্যায় এইচএসসি পরীক্ষা ইস্যু রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বন্যাকবলিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির নেতারা বলছেন, পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এনসিপি বলছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিচু সড়ক ও এলাকা পানিতে তলিয়ে দীর্ঘ যানজট ও চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এমন এক দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও গত ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা দেশব্যাপী অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য বা যুক্তিসঙ্গত নয়।
একই ধরনের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও। ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথক বিবৃতিতে পরীক্ষা স্থগিত অথবা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দুর্গত এলাকার শিক্ষার্থীরা।
