নিজস্ব প্রতিবেদক:: টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো এখন লণ্ডভণ্ড। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাতটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখের বেশি মানুষ। ১ লাখ ৫৫ হাজারেরও বেশি পরিবার বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে পরিস্থিতি সবচেয়ে শোচনীয়। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে নতুন করে ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় বানভাসি লাখ লাখ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন এক কঠিন জাতীয় সংকটে বরাবরের মতোই আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছেন দেশের আলেম-উলামা ও সর্বস্তরের ইসলামী সংগঠনগুলো।
টেকসই পুনর্বাসন: ৩০০ পরিবারকে পাকা ঘর দিচ্ছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
বন্যা কবলিত এলাকায় ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া গৃহহীন ৩০০টি পরিবারকে নতুন টেকসই বাসস্থান তৈরি করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় এই পরিবারগুলোকে দুই কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল টিনের’ নতুন পাকা ঘর উপহার দেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে এক পোস্টে এই মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রকল্পের কথা নিশ্চিত করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় যেসব মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ঘরগুলো তৈরিতে দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত ইন্ডাস্ট্রিয়াল টিন এবং চারপাশে পাকা দেয়াল ব্যবহার করা হবে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিবারগুলোকে নিরাপত্তা দেবে।
পাশাপাশি, ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার বন্যাদুর্গত পরিবারের জন্য মোট ১৪৩ টন খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কাজ চলছে (পূর্বের ৮১ টনের সাথে যুক্ত হয়েছে আরও ৬২ টন)। একই সাথে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৫টি ইউনিয়নের ২ হাজার বন্যার্ত পরিবারের মাঝে জরুরি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ চলছে। প্রথম ধাপে চট্টগ্রামের বন্যাপ্লাবিত ৮টি উপজেলার ৬০০০টি পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দুর্গত ৮টি উপজেলায় ৫০ টন পশুখাদ্য দেওয়ার প্রস্তুতিও চালাচ্ছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন।
রান্নাঘর পানির নিচে: গরম খাবার নিয়ে আল-মারকাজুল ইসলামী
বন্যার পানিতে অসংখ্য পরিবারের রান্নাঘর ও চুলা ডুবে গেছে। ফলে রান্না করার কোনো সুযোগ নেই। দিনের পর দিন শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করছেন দুর্গতরা। এই কঠিন সময়ে বন্যাকবলিত মানুষের মুখে একবেলা গরম পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দিতে কাজ করছে আল-মারকাজুল ইসলামী। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য গরম পোলাও ও মুরগির তরকারির বিশেষ খাবারের প্যাকেজ প্রস্তুত করে দ্রুত বানভাসিদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে।
বন্যাকবলিত এলাকায় মাওলানা মামুনুল হক ও উলামা নেতৃবৃন্দ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীরে মজলিস মাওলানা মামুনুল হক চট্টগ্রামের দস্তিদারহাট, কেওচিয়া ও সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি বন্যাদুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন এবং সংগঠনের চলমান ত্রাণ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “এই দুর্যোগের সময়ও আপনারা একা নন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আপনাদের পাশে রয়েছে এবং ইনশাআল্লাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে।” তিনি সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তবানদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের উদ্যোগে বন্যাকবলিত এলাকায় খাদ্যসামগ্রী, চাল, ডাল, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানিসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। সফরে আমীরে মজলিসের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের নায়েবে আমীর মাওলানা আলী উসমান, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ফয়সাল আহমাদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
হাফেজ্জী হুজুর সেবা ফাউন্ডেশন ও তাগলীবে দ্বীন ফাউন্ডেশনের তৎপরতা
চট্টগ্রামের বন্যা কবলিত এলাকায় আল্লাহর প্রিয় মাখলুকের মাঝে খেদমতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে হাফেজ্জী হুজুর রহ. সেবা ফাউন্ডেশনের ৯ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবী কাফেলা। অন্যদিকে, আল্লামা মামুনুল হকের পরিচালনায় ‘তাগলীবে দ্বীন ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগকবলিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও ইসলামী দায়িত্ব, যা তারা অব্যাহত রাখবেন।
উদ্ধার ও পুনর্বাসনে ইসলামী আন্দোলন এবং উলামা মাশায়েখ পরিষদ
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় উলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের ব্যানারে আলেমদের একাধিক টিম দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। দলের মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়ক কে এম শরীয়াতুল্লাহ জানান, গতকাল রোববার দলের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ত্রাণ বিতরণ ও তদারকি করেছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় উলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সেক্রেটারি মুফতি রেজাউল করীম আবরারের নেতৃত্বেও ব্যাপক ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। আজ সোমবার সকাল থেকে সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন মারুফুল ইসলাম, মামুন বিন মনির, আবু বকর ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের আরিফুল ইসলাম। পশ্চিম বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নে মাওলানা আহমদুর রহমান ও ওলামা মাশায়েখ নেতা মাওলানা শাহেদুর রহমানের নেতৃত্বে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।
এছাড়া পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের কারণে ঝুঁকিতে পড়া বসতবাড়ি মেরামতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার একটি স্বেচ্ছাসেবী দল।
সাতকানিয়ার পাশে ঢাকার ‘বৃহত্তর উত্তরা উলামা পরিষদ’
রাজধানী ঢাকার ‘বৃহত্তর উত্তরা উলামা পরিষদ’ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বানভাসি মানুষের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সংগঠনের উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব।
ত্রাণ বিতরণ শেষে ওলামায়ে কেরাম বন্যাকবলিত সকল মানুষকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার তাওফিক দান করতে এবং চলমান এই মানবিক প্রচেষ্টাকে কবুল করার জন্য মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে বিশেষ দোয়া মোনাজাত করেন।
