নিজস্ব প্রতিবেদক:: রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল, যাত্রী টানাটানি, বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, অবৈধ রুট পরিচালনা এবং সড়কে বাস পার্কিংয়ের মতো সমস্যা সমাধানে নতুন রুট কাঠামো প্রণয়ন করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে সচল প্রায় ৯৮টি বাস রুট কমিয়ে সার্কুলার ও কমিউটার সার্ভিসসহ প্রায় ৬০টিতে নামিয়ে আনা হবে। এর মধ্যে ৩২টি রুট নিয়ে ইতোমধ্যে ডিটিসিএ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। বাকি রুটগুলোও দ্রুত চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একই পথে অপ্রয়োজনীয় বাস চলাচল কমবে, যাত্রী তোলাকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা ও বিশৃঙ্খলা হ্রাস পাবে এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমবে এবং সেবার মান উন্নত হবে।
ডিটিসিএর জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে বাস্তবে সচল বাস রুট রয়েছে ৯৮টি। অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অনুমোদিত বাস রুটের সংখ্যা ৪১৮। এর মধ্যে বৈধ রুট পারমিট রয়েছে মাত্র ৮০টির। এ ছাড়া হাতিরঝিলে দুটি সার্কুলার রুট এবং কোনো রুট পারমিট ছাড়াই আরও ১৬টি রুটে নিয়মিত বাস চলাচল করছে। History
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসের জরিপের ভিত্তিতে নতুন রুট পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ সময় ৫ হাজার অফিসগামী, ১০ হাজার শিক্ষার্থী এবং ১০ হাজার মেট্রোরেল ব্যবহারকারীর মতামত নেওয়া হয়।
জরিপে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ বাসে যাতায়াত করেন। সবচেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানামা করেন উত্তরা, গাজীপুর, সাভার, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান ও সদরঘাট করিডরে। তাই নতুন পরিকল্পনায় এসব করিডরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ডিটিসিএর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ বাস রুট ৩০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ, যা নগর পরিবহনের জন্য কার্যকর নয়। একই পথে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচলের কারণে যাত্রী টানাটানি, বেপরোয়া প্রতিযোগিতা এবং যানজট বাড়ছে। তাই নতুন পরিকল্পনায় একটি করিডরে সীমিতসংখ্যক অপারেটরের মাধ্যমে বাস পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজন ছাড়া রুটের পুনরাবৃত্তিও কমানো হবে।
জরিপে বাস টার্মিনাল ও ডিপোর সংকটকেও যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, মোহাম্মদপুর, রিং রোড, শনিরআখড়া, মিরপুর-১২, আবদুল্লাহপুর, টঙ্গী ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের শেষে সড়কের ওপর বাস পার্কিং করা হয়। এতে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে গিয়ে যানজট বাড়ে।
এ সমস্যা সমাধানে নতুন টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণ, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা এবং বাস রুটের শুরু ও শেষ প্রান্ত নগরীর কেন্দ্রীয় অংশের বাইরে নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সর্বশেষ মতবিনিময় সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, বর্তমানে সচল নয়—এমন অনুমোদিত বাস রুট বাতিল করা হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন এক হাজারের বেশি বাস দ্রুত সড়ক থেকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। রুট চূড়ান্ত হওয়ার পর কোন কোম্পানি কোন রুট পরিচালনা করবে, তা নির্ধারণ করা হবে। একটি রুটে একটি অপারেটর রাখার নীতি অনুসরণ করা হবে এবং ফিটনেস, রুট পারমিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেই বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের বিকল্প নেই। তবে এটি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে বাসগুলোকে নির্ধারিত রুট, স্টপেজ, সময়সূচি ও গতিসীমা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
