নিজস্ব প্রতিবেদক:: কওমি মাদরাসা স্থাপনের নীতিমালা ও পৃথক হাফেজিয়া মাদরাসা বোর্ড গঠনের সরকারি উদ্যোগকে ‘২০১৮ সালের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ। একই সঙ্গে কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অবস্থানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি শায়েখ আব্দুল হক, সিনিয়র সহ-সভাপতি নেসার আহমদ আন-নাছেরী, সাধারণ সম্পাদক শায়েখ সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি আব্দুল কাইয়ুম মোল্লা এ বক্তব্য দেন।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, ২০১৮ সালের আইনের মাধ্যমে কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থার যে আইনগত স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা কোনোভাবেই খর্ব বা বিভক্ত করার সুযোগ নেই। ফলে কওমি মাদরাসা স্থাপনের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন কিংবা হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের উদ্যোগ আইনের মূল চেতনা ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
তারা বলেন, কওমি শিক্ষাব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে দেশের আলেম-উলামার ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা এবং নিজস্ব শিক্ষাধারার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। নতুন করে পৃথক বোর্ড বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ কওমি অঙ্গনে বিভ্রান্তি, অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
নেতৃবৃন্দ কওমি মাদরাসা-সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আল-হাইআতুল উলয়া, দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, ২০১৮ সালের আইনের পরিপন্থী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের প্রতি বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কওমি মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য, ঐক্য ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেই দেশের শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়নে এ ধারার অবদান আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে হাফেজ মোশাররফ হোসাইন মাহমুদ, মাওলানা ক্বারী সাইদুল ইসলাম আসাদ, মাওলানা যোবায়ের আহমদ, মাওলানা জাফর আহমদ মজুমদারসহ অন্য শীর্ষ আলেম ও উলামারা এই বিবৃতির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
হাইআতুল উলয়ার বৈঠক বর্জন
এর আগে কওমি মাদরাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের সরকারি উদ্যোগকে ‘২০১৮ সনের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ দাবি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডাকা এক বিশেষ সভায় অংশগ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’।
বুধবার (৮ জুলাই) কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এই অপারগতা ও আপত্তির কথা জানানো হয়। আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশক্রমে ও কো-চেয়ারম্যান আল্লামা শেখ সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানা গেছে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬ এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক কওমি মাদরাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন, দেশের সকল হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মমুখী শিক্ষার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামীকাল ৯ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি সভা আহ্বান করা হয়। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মোঃ দাউদ মিয়ার সভাপতিত্বে ওই সভায় হাইআতুল উলয়ার শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তবে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের নোটিশে ঢাকার বাইরে অবস্থানরত সদস্যদের পক্ষে সভায় যোগ দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে হাইআতুল উলয়া।
এছাড়া সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে সংস্থাটি তাদের সুষ্পষ্ট বক্তব্য তুলে ধরেছে।
নীতিমালা প্রণয়ন নিয়ে আপত্তি
হাইআতুল উলয়া চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আইন, ২০১৮’ -এর ধারা ২ (চ) অনুযায়ী— নেসাবে তা’লীম (পাঠ্যক্রম), শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণসহ মাদরাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কওমি মাদরাসা সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থেকে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখবে।
বর্তমানে হাইআতুল উলয়ার অধীন ৬টি বোর্ডের প্রতিটির নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। নতুন করে সরকার কর্তৃক নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে তা কওমি মাদরাসার স্বকীয় নীতিমালার ওপর হস্তক্ষেপ হবে, যা আইনের পরিপন্থী।
হাফেজিয়া মাদরাসার পৃথক বোর্ড ‘অবান্তর’ পৃথক হাফেজিয়া বোর্ড গঠনের উদ্যোগকে ‘অবান্তর’ আখ্যা দিয়ে কওমি কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশের প্রায় সব হাফেজিয়া মাদরাসায় ইতোমধ্যে আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী হাইআতুল উলয়ার অধীনে থাকা ৬টি বোর্ডের যেকোনো একটির সঙ্গে অধিভুক্ত রয়েছে। ফলে নতুন করে পৃথক বোর্ড গঠনের চিন্তা আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট এসব সংবেদনশীল বিষয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়ে সরকারের এই ধরনের সকল উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছে আল-হাইআতুল উলয়া।
বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং ধর্মমন্ত্রীকে অবহিত করতে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, শিক্ষামন্ত্রী ও ধর্মমন্ত্রীর একান্ত সচিবকেও চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বলে দপ্তর সম্পাদক মু. অছিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
