৩৬নিউজ ডেস্ক: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সারা দেশে দ্বিতীয় দিনের মতো ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত রক্তাক্ত ও নজিরবিহীন সহিংসতার এই দিনে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র হামলায় অন্তত ৬৭ জন নিহত হন। এর মধ্যে কেবল ঢাকাতেই ৬২ জন, রংপুরে দুজন এবং সাভার, সিলেট ও নরসিংদীতে একজন করে নিহতের খবর পাওয়া যায়। এ নিয়ে টানা তিনদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫০ জনে। নিহতদের অধিকাংশের শরীরে গুলি ও মাথায় মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়ে ওইদিন রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করে তৎকালীন সরকার।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। রামপুরা টিভি সেন্টারসংলগ্ন সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়, যার ফলে বিটিভি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড, নতুনবাজার ও প্রগতি সরণিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির গভীর রাত পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে। কুড়িল চৌরাস্তা ও কালাচাঁদপুর এলাকায় লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় হামলা চালায়। কুড়িল এলাকায় র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং গুলি করার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিজয়নগর, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার ও ধানমন্ডিতে দিনভর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। উত্তরায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একটি সশস্ত্র শোডাউন শিক্ষার্থীদের ধাওয়ার মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ঢাকার বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেটসহ ৩১টি জেলা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার ঘটনায় কারারক্ষীদের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে বেশ কিছু কয়েদি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
নজিরবিহীন এই উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে সরকারের নির্দেশে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এতে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে মোট নিহতের সংখ্যা ১০৩ জন দাবি করা হলেও বিভিন্ন স্বাধীন সূত্রে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। সংকটকালীন মুহূর্তে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির উদ্যোগের কথা জানিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সরকারের এই সংলাপের প্রস্তাবকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
রাত সাড়ে ৯টায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে নতুন করে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ছাত্রহত্যার দায় নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পদত্যাগ, দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগ, হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং আন্দোলনকারীদের হয়রানি না করার নিশ্চয়তা প্রদান। একই দিনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে নেতাকর্মীদের সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
টিএইচএ/
