ভারতের সিকিম রাজ্যের নামচি জেলার সমারডুং এলাকায় এনএইচপিসি-র তিস্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, পাহাড়ের ধস ও বিষাক্ত মিথেন গ্যাসের তীব্র প্রভাবে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। এতে অন্তত ২০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে সিকিম প্রশাসন। খবর পেয়ে উদ্ধারকারী দল বুধবার সকাল পর্যন্ত ১৩ জন শ্রমিকের মৃতদেহ সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করেছে। পরবর্তীতে টানেলের গভীর ও বিভিন্ন দুর্গম অংশে বাকি ৭ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়। এছাড়া সুড়ঙ্গের অন্যান্য অংশে এখনও অন্তত ৫ জন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তবে তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।
গত মঙ্গলবার শ্রমিকদের দুপুরের খাবারের বিরতির সময় আকস্মিকভাবে এই বিপর্যয় নেমে আসে। প্রাথমিক তথ্যসূত্রে জানা গেছে, সুড়ঙ্গে ধস ও বিস্ফোরণের মুহূর্তে সেখানে মোট ২৭ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। আকস্মিক ভয়াবহতার মুখে পড়ে দুজন শ্রমিক কোনোক্রমে জীবন বাঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও বাকি ২৫ জন ভেতরে আটকা পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা তৎক্ষণাৎ উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। পরবর্তীতে খবর পেয়ে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিপর্যয় মোকাবেলা বাহিনী (এসডিআরএফ), এনডিআরএফ এবং মঙ্গল রাতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের (ইসিএল) উদ্ধারকারী টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে।
উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের সুপারিন্টেনডেন্ট অভিজিৎ কুন্ডু জানান, সুড়ঙ্গের ভেতরে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ বিরাজ করছে এবং সেখান থেকে যাদের বের করা হয়েছে, দুর্ভাগ্যবশত তাদের প্রত্যেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি জানান, সুড়ঙ্গের ভেতরে এখনও বেশ কয়েকটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেছে এবং সেখান থেকে মৃতদেহগুলো বের করে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে তাদের দল। এনডিআরএফ ও কোল ইন্ডিয়ার যৌথ উদ্ধারকারী দল পুরো সুড়ঙ্গটিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালাচ্ছে।
দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং এবং রাজ্যপাল ওম প্রকাশ মাথুর। উদ্ধার অভিযান তদারকি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ঘটনার নেপথ্যে কারিগরি কিংবা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা তদন্ত করে দেখা হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনায় কোম্পানির অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। একই সাথে সিকিম রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে চার লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি নজরদারিতে ঘটনাস্থলে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং উত্তরবঙ্গের আইজি সুকেশ জৈন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহত শ্রমিকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা অন্তত ৯ জন রয়েছেন, যারা প্রধানত ডুয়ার্সের কিলকট, ইন্দং ও নাগেশ্বরী চা বাগানের শ্রমিক ছিলেন। এই ঘটনায় পুরো জলপাইগুড়ি এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকস্তব্ধ পরিবারগুলোর সদস্যদের অকুস্থলে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সুড়ঙ্গে আটকে পড়া সকল শ্রমিককে পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার না করা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে যৌথ উদ্ধারকারী দল।
টিএইচএ/
