কোরিয়ান তরুণ বৌদ্ধ কিবিন কিমের প্রশ্ন ও এক সন্ধ্যার গল্প

by hsnalmahmud@gmail.com

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান >>

শনিবার, বাদ মাগরিব। আমি আনসান মসজিদের দ্বিতীয় তলায় তাফসীর মাহফিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি। হঠাৎ দেখি, এক তরুণ কোরিয়ান আমার দিকে এগিয়ে আসছে। হাতে একটি ছোট গিফট। আমাকে হ্যান্ডশেক করিয়ে গিফটটি দিল। এরপর ব্যাগ থেকে বের করল তার গবেষণাপত্র। আমি স্মরণ করার চেষ্টা করলাম—ওর সাথে কোথায়, কবে পরিচয় হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
banner

ধীরে ধীরে মনে পড়ল—হানিয়াং ইউনিভার্সিটির ছাত্র, নাম কিবিন কিম। নৃতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করে। আনসানের মুসলিম সমাজকে ঘিরে একটি গবেষণা করছে। কয়েক মাস আগে দীর্ঘ সময় কথা বলেছিল আমার সাথে, পরে গবেষণাপত্রের একটি খসড়া সম্পাদনার জন্যও পাঠিয়েছিল।

আজ মাহফিলে শ্রোতা কম। শুনলাম, কিছু দূরে একজন ভাই F-5 ভিসা পেয়েছেন, সে উপলক্ষে আয়োজন আছে—সেই দাওয়াতে অনেকে চলে গেছেন। আমিও তাফসীর সংক্ষিপ্ত করলাম, বিশেষত কিবিন কিমের উপস্থিতি বিবেচনায়। আজ ছিল মাসের শেষ শনিবার, তাই তাফসীর শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বও রেখেছিলাম।

কিবিনও একটি প্রশ্ন করল—তার হাতের লেখা বুঝতে পারছিলাম না, তাই বললাম মোবাইলে লিখে দিতে। সে কাকাউ মেসেঞ্জারে লিখে পাঠাল:
“How can we prepare for sudden death, such as earthquakes or flod or accidents?”

আমি বললাম, হঠাৎ মৃত্যু আমাদের হাতে নেই। বরং এখনকার মুহূর্তগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর সময় কেউ ঠেকাতে পারবে না, তাই সেই অমোচনীয় বাস্তবতা থেকে নয়, জীবনকে মূল্যবান করার পথ থেকেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত।

অনুষ্ঠান শেষ হলো। তারপর মনে হলো, আসলে কিবিনের প্রশ্নের পেছনে তার ভয় কাজ করছে। হঠাৎ মৃত্যু—এই ভাবনাই হয়তো তাকে প্রশ্ন করিয়েছে।

আমরা তৃতীয় তলায় দস্তরখানে বসেছি। কামরুল ভাই বললেন, কিবিনকে আলাদা প্লেটে খাওয়ানো হোক। আমি বললাম, না, একসাথে খাই—এতে কথা বলা সহজ হয়। তবে ওদের চামচে অভ্যস্ততা মাথায় রেখে চামচ রাখলাম।

আমার পাশে ছিল দাউদ—এক তরুণ, যার বাবা কাজাখ, মা কোরিয়ান। চেহারায় তাকে কোরিয়ানই মনে হয়। কয়েক দিন আগে সে তার ছোট ভাইকে নিয়েও এসেছিল। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাইটিও কি মুসলিম? সে বলেছিল, না, তাদের পরিবারে কেবল দাউদই মুসলিম।

দাউদের বয়স ১৯। কিবিন কিম বয়সে কিছুটা বড়। দুই তরুণ, দুই ধর্ম—তবু আজ একসাথে গল্পে মগ্ন। দাউদ জিজ্ঞেস করলো,
—“Are you Catholic?”
কিবিন বললো,
—“No, I’m Buddhist.”

—“Are you a follower or just Buddhist by birth?”
এই প্রশ্নটা গভীর ছিল। কারণ কিবিন আমাকে আগে বলেছিল, সে কোনো ধর্ম মানে না। আজ সে বলছে, কঠোরভাবে বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করে। হয়তো একজন মুসলিম ইমামের সামনে নিজেকে নিরপেক্ষ ভাব দেখাতে চেয়েছিল।

কিবিনও দাউদকে জিজ্ঞেস করলো,
—“Were you born Muslim?”
দাউদ উত্তর দিল,
—“No. I was born Catholic. My mom is Catholic. My father was Muslim but not practicing. Before dying, he gave me a Kazakh Quran, some Islamic books, and a prayer mat. After his death, I began exploring Islam. During COVID, I was alone a lot and thought deeply. Then I decided—I want to be Muslim.”

এই কথাগুলো বলার সময় দাউদের চোখ টলমল করছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম—একজন কিশোর তার অন্তরের কথা বলছে। তার চোখে ছিল অনুশোচনা, আবেগ আর হেদায়াতের আলো।

আমি বুঝলাম, এটাই কিবিনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার উপযুক্ত সময়। বললাম,
—“What is death, Kibin? It’s not annihilation. It’s a transition. If sudden death comes, why fear? It doesn’t end everything. Another life begins. A life that’s eternal. So the real preparation is how we live this short life meaningfully.”

দাউদ আবার প্রশ্ন করলো,
—“Do Buddhists believe in a Creator?”
কিবিন বললো,
—“No, in Buddhism there’s no idea of Creator.”
—“So, you believe in nothing?”
—“Not exactly. We believe less. There’s no firm belief in a creator, but it’s not a rejection either.”

আমি বললাম,
—“That’s a great confusion. If there’s no rejection, then maybe there’s space for reflection. Like a child who never saw his parents, but later discovers them—won’t it be joyful?”
কিবিন মাথা নেড়ে বলল,
—“Yes, very joyful.”
—“Then think—maybe finding the Creator is also joyful. Just like your phone can’t come without a maker, this vast universe also cannot exist without one.”

আমরা গল্পে মগ্ন। বাকিরা খাওয়া শেষ করে উঠে গেছে। নামাজের সময় হয়ে গেছে। আমি নিচে নামছি, কিবিনও আমার সাথে নামল। বললাম,
—“Stay a while, after prayer I’ll read your research.”
সে বলল,
—“It’s late. I must go.”

আমি অতিথিদের সাথে সরাসরি দাওয়াত দিতে চাই না। সময়ের সাথে হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে চাই। আজও আমার ইচ্ছা ছিল না ধর্ম নিয়ে আলাপ হবে। কিন্তু দাউদের প্রশ্নে আমাকে কথা বলতে হলো। জানি না, কিবিন কিভাবে নিল, কিন্তু আমার বিশ্বাস, কিছু একটা তার হৃদয়ে পৌঁছেছে।

اللهم اهد قلب كيبين كيم، وثبتنا جميعًا على دينك.
হে আল্লাহ! কিবিন কিমকে হেদায়াত দিন, আমাদের সকলকে আপনার দ্বীনে দৃঢ়তা দিন।

লেখক: প্রবাসী আলেম স্কলার ও দাঈ।

হাআমা/

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222