আফগানিস্তান, বহু দশক ধরে যুদ্ধ, অস্থিরতা ও সংকটের কারণে বিশ্বমঞ্চে আলোচিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির চিত্র ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। তালেবান প্রশাসনের অধীনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আফগানিস্তান আবারও পর্যটকদের আকর্ষণ করতে শুরু করেছে।
সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মাত্র এক মাসে দুই হাজারেরও বেশি বিদেশি পর্যটক দেশটিতে ভ্রমণ করেছেন। এটি শুধু আফগানিস্তানের জন্যই নয়, বরং গোটা অঞ্চলের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে বিদেশিরা
আফগানিস্তানকে বলা হয় পাহাড়-পর্বতের দেশ। তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ, সবুজ উপত্যকা আর আঁকাবাঁকা নদী দেশটির প্রকৃতিকে দিয়েছে অন্যরকম মহিমা। কাবুল, বামিয়ান, পাঞ্জশির বা বাদাখশানের মতো জায়গাগুলো পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আফগানিস্তান যেন এক অদেখা স্বর্গরাজ্য, যেখানে একদিকে আছে দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়ি দৃশ্য, অন্যদিকে স্নিগ্ধ সবুজ সমতলভূমি।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
আফগানিস্তান শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং তার সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্যও খ্যাত। এখানে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন। বামিয়ানের গুহা, প্রাচীন মসজিদ, দুর্গ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে অমূল্য সম্পদ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভ্রমণকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিশেষভাবে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন ঘুরে দেখতে এসেছিলেন।
নিরাপত্তার উন্নতি
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রায়ই অশান্তির দেশ হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। দেশব্যাপী চেকপোস্ট ও টহল ব্যবস্থা জোরদার হওয়ায় বিদেশিদের জন্য ভ্রমণ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে। পর্যটন খাতে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা জোরদার না হলে বিদেশি পর্যটকরা আফগানিস্তানে পা রাখতেন না।
উন্নয়ন ও অবকাঠামো
তালেবান প্রশাসন কেবল নিরাপত্তাই নয়, বরং অবকাঠামো উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে। সীমান্ত ও বিমানবন্দরগুলোতে প্রবেশাধিকার সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে স্থলবন্দর দিয়েই সবচেয়ে বেশি পর্যটক প্রবেশ করছেন। বিশেষ করে নিমরোজ, হেরাত ও হাইরাতান বন্দর দিয়ে ভ্রমণকারীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া রাস্তা, হোটেল ও ভ্রমণকেন্দ্রের সুযোগ-সুবিধা উন্নত করতে সরকারের পদক্ষেপ বিদেশি পর্যটকদের আস্থা জোগাচ্ছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা
আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও অক্ষত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একে ভবিষ্যতে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশই যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে পর্যটক হারাচ্ছে, ঠিক তখন আফগানিস্তান নতুনভাবে ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
তালেবান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
তালেবান প্রশাসন পর্যটন খাতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি নতুন দ্বার হিসেবে দেখছে। কর্মকর্তারা মনে করেন, পর্যটক আগমন বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আফগানিস্তানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠবে।
একসময় যেসব বিদেশি কেবল নিরাপত্তার কারণে আফগানিস্তান থেকে দূরে থাকতেন, তারাই এখন দেশটির পাহাড়-পর্বত, ঐতিহাসিক নিদর্শন আর অতিথিপরায়ণ মানুষের টানে ছুটে আসছেন। হু হু করে বাড়তে থাকা পর্যটকের সংখ্যা প্রমাণ করছে যে আফগানিস্তান ধীরে ধীরে নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে—যেখানে শান্তি, সৌন্দর্য ও উন্নয়ন মিলেমিশে গড়ে তুলছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় দেশ।
এআইএল/
