প্রথমবারের মতো মহাকাশের প্রান্ত ছুঁয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসে ইতিহাস গড়লেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নভোচারী মিকেলা বেন্থাস।
শনিবার পাঁচজন সহযাত্রীর সঙ্গে রকেট ভ্রমণে অংশ নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন জার্মানির এই পক্ষাঘাতগ্রস্ত ইঞ্জিনিয়ার। মহাশূন্যে ওজনহীন অবস্থায় ভাসতে ভাসতে যখন অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন তখন তার হুইলচেয়ারটি পড়ে ছিল পৃথিবীতে।
সাত বছর আগে এক মাউন্টেন বাইক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়া বেন্থাস প্রথমবারের মতো হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হিসেবে মহাকাশে গিয়ে ইতিহাস গড়লেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান।
মার্কিন ই কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু অরিজিন’-এর রকেটে চড়ে পশ্চিম টেক্সাস থেকে এই যাত্রা শুরু করেন বেন্থাস। তার সঙ্গে ছিলেন জার্মানিতে জন্ম নেওয়া স্পেসএক্স-এর অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী হ্যান্স কোয়েনিগসম্যান।
এ সফরের আয়োজনে সহায়তা করেছেন কোয়েনিগসম্যান। ব্লু অরিজিনের পাশাপাশি বেন্থাসের এই ভ্রমণ স্পন্সরও করেছেন তিনি, তবে টিকিট বা ভ্রমণের খরচ প্রকাশ করেননি।
অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে বেন্থাস বলেছেন, মহাকাশযানের ওপরে ওঠার পুরোটা সময়জুড়ে হেসে কাটিয়েছেন তিনি। ক্যাপসুলটি পৃথিবীর প্রায় ১০৫ কিলোমিটার উঁচুতে উঠেছিল। মহাকাশে পৌঁছানোর পর সেখানে উল্টো হয়ে ঘোরার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।
অবতরণের কিছুক্ষণ পরেই বেন্থাস বলেছেন, “মহাকাশ ভ্রমণ ছিল আমার জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা।”
ব্লু অরিজিন বলেছে, ১০ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত মহাকাশ ভ্রমণের জন্য বেন্থাসের শারীরিক অবস্থা অনুসারে খুব সামান্য কিছু পরিবর্তন আনার প্রয়োজন ছিল তাদের। যার কারণ হচ্ছে, স্বয়ংক্রিয় ‘নিউ শেপার্ড’ ক্যাপসুলটি এমনভাবে তৈরি, যেখানে সবার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছে তারা।
এ মহাকাশ ভ্রমণের ক্রু সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ব্লু অরিজিনের ইঞ্জিনিয়ার জেক মিলস এবং উৎক্ষেপণের দিনে সহায়তাও করেছেন তিনি।
মিলস বলেছেন, “চিরাচরিত মহাকাশ ভ্রমণের তুলনায় এ ভ্রমণকে আরও বেশি রকম মানুষের জন্য উপযোগী করে তৈরি করেছি আমরা।” ব্লু অরিজিনের আগের মহাকাশ পর্যটকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন যাদের চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা ছিল বা যারা দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তিহীন, এমনকি ৯০ বছর বয়সী দুজন প্রবীণও এই তালিকায় ছিলেন।
বেন্থাসের সুবিধার জন্য ব্লু অরিজিন রকেটে ‘পেশেন্ট ট্রান্সফার বোর্ড’ যুক্ত করেছিল কোম্পানিটি, যাতে সহজে ক্যাপসুলের প্রবেশপথ থেকে নিজের সিট পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারেন তিনি।
এ ছাড়া, অবতরণের পর মরুভূমির বুকে উদ্ধারকারী দল দ্রুত একটি কার্পেট বিছিয়ে দেয়, যাতে তিনি সরাসরি নিজে হুইলচেয়ারটি ব্যবহার করতে পারেন, যা উড্ডয়নের সময় নিচে রেখে গিয়েছিলেন বেন্থাস। আগেভাগেই এসব প্রক্রিয়ার মহড়া দিয়েছিলেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালে হিউস্টন থেকে পরিচালিত এক প্যারাবোলিক প্লেনের মাধ্যমে মহাশূন্যের ওজনহীনতার প্রাথমিক অভিজ্ঞতার স্বাদ পেয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি প্রোগ্রামের সদস্য ৩৩ বছর বয়সী বেন্থাস। এর দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পোল্যান্ডে দুই সপ্তাহব্যাপী এক কৃত্রিম মহাকাশ মিশনেও অংশ নিয়েছেন তিনি।
এ মহাকাশ ভ্রমণের পর বেন্থাস বলেছেন, “আপনার স্বপ্নের বিষয়ে কখনোই হাল ছাড়া উচিত নয়, তাই না?”
মহাকাশ ভ্রমণের বিষয়ে অনড় ছিলেন বেন্থাস। তার লক্ষ্য কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য মহাকাশ জয়কে সহজ করা নয়, বরং এ ধরনের কাজে নিজেদের জন্য যাতায়াত ও সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন ঘটানো।
“আমি সত্যিই আশা করি, আমার মতো মানুষদের জন্য মহাকাশ জয়ের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে। এ তো কেবল শুরু।”
২০০০ সালে ‘ব্লু অরিজিন’ প্রতিষ্ঠা করেন বিলিয়নেয়ার বেজোস এবং ২০২১ সালে নিজের প্রথম যাত্রীবাহী মহাকাশ রকেট পরিচালনা করেন তিনি। এরপর থেকে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে নিজেদের আরও বড় এবং শক্তিশালী ‘নিউ গ্লেন’ রকেট ব্যবহার করে বিভিন্ন মহাকাশযানকে কক্ষপথে পৌঁছে দিচ্ছে কোম্পানিটি। বর্তমানে চাঁদে ল্যান্ডার বা অবতরণযান পাঠানোর লক্ষ্যেও কাজ করছে ব্লু অরিজিন।
এনআর/
