হাসান আল মাহমুদ >>
দশ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মাধ্যমে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে যে সমঝোতা ও পারস্পরিক আস্থার বার্তা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তব মাঠপর্যায়ে তার বিপরীত চিত্রই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একের পর এক আসনে জোটের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থীদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি, অপপ্রচার এমনকি আর্থিক প্রলোভনের অভিযোগ উঠছে। এতে করে জোট রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ও ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগরী পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনে দশ দলীয় জোটের ঘোষিত প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুফতি ইমরান ইসলামাবাদীকে জোটের প্রধান শরিক জামায়াতের স্থানীয় নেতারা প্রকাশ্যে হুমকি ও চাপ দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় জোটের শীর্ষ নেতাদের সংবাদ সম্মেলনে এই আসনটি খেলাফত মজলিসকে দেওয়া হলেও, পরদিন জুমাবার থেকেই জামায়াতের দক্ষিণ জেলা ও স্থানীয় নেতারা তাদের প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসানকে সমর্থন দিতে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে বলা হচ্ছে—আনোয়ারা এলাকায় জামায়াতের প্রার্থীই নির্বাচন করবেন। এমনকি জোট ঘোষিত তালিকাকে ‘ভুয়া’ বা ‘অপপ্রচার’ বলেও ন্যারেটিভ ছড়ানো হচ্ছে, যা জোট শৃঙ্খলার সরাসরি লঙ্ঘন।
চাঁদপুর–১ আসনেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। দশ দলীয় জোট থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মুফতি আনিসুল হককে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও, জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে হয়। সেখানে জামায়াত তাদের প্রার্থী মাওলানা আবু নছর আশরাফীকেই চূড়ান্তভাবে দাঁড় করায়। সমালোচকদের মতে, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—যে আসনে জামায়াতের ন্যূনতম সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে, সেখানে তারা শরিকদের জন্য কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
নরসিংদী–৩ (শিবপুর) আসনে অভিযোগ আরও গুরুতর। স্থানীয় বাসিন্দা হাবীবুল্লাহ সিরাজ জানান, দশ দলীয় জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পরও জামায়াত গোপন বৈঠক, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং শেষ দিন পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার না করে প্রকাশ্য বিদ্রোহে জড়ায়।
এমনকি এক ভিডিও বার্তায় নরসিংদী–৩ আসনের জোট মনোনীত রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা রাকীবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তাকে এক কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। যদিও জামায়াত প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান কাওসার শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।
এই পরিস্থিতি নিয়ে খেলাফত মজলিস সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন—এটা কি আদৌ কোনো ঐক্য? নাকি সুবিধাবাদী রাজনীতির আরেকটি সংস্করণ? কেন্দ্রের ঘোষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এমন সাংঘর্ষিক চিত্রকে তারা ‘জোট রাজনীতির দ্বিমুখী আচরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু কয়েকটি আসনের দ্বন্দ্ব নয়; বরং দশ দলীয় জোটের নৈতিক ভিত্তি ও পারস্পরিক আস্থার ওপর বড় ধরনের আঘাত। শরিকের সিদ্ধান্ত মানতে না পারা এবং চাপের রাজনীতি অব্যাহত থাকলে, এই জোট ভবিষ্যতে জনগণের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য থাকবে—সে প্রশ্নই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
হাআমা/
