মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর আগুনের দখলে। গত কয়েকদিন ধরে চলা ইরান, ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যকার সংঘাত আজ এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন বাংলাদেশি ও একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, তেহরান থেকে তেল আবিব, প্রতিটি বড় শহর এখন ধ্বংসস্তূপ আর লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণে বিশ্ব এক অনিশ্চিত মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
আজ রোববার সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি আবাসিক কমপাউন্ডে ইরানের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সৌদি সিভিল ডিফেন্স এজেন্সির তথ্যমতে, এই হামলায় একটি বহুতল ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই একজন বাংলাদেশি এবং একজন ভারতীয় প্রবাসী নিহত হন। এছাড়া আরও ১২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর জানিয়েছে, তারা মূলত আল-খার্জের রাডার ব্যবস্থা ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, ১ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতে এবং ২ মার্চ বাহরাইনে একইভাবে ইরানের হামলায় আরও দুই বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছিলেন। ৮ দিনের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যে ৩ জন বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুতে ঢাকাসহ প্রবাসীদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর দফায় দফায় হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরান এখন এক জ্বলন্ত শহর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের প্রধান সড়কগুলো দিয়ে তেলের পাইপলাইন ফেটে যাওয়া জ্বালানি বয়ে যাচ্ছে, যা আগুনের লেলিহান শিখায় আচ্ছন্ন। একে স্থানীয়রা আগুনের নদী বলে বর্ণনা করছেন।
তেহরানের প্রধান তেল শোধনাগারে ইসরায়েলি হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। আকাশ কালো ধোঁয়ায় ধেকে গেছে, যা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও দৃশ্যমান। রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, ইরানে এ পর্যন্ত ১,৩৩২ জন নিহত হয়েছেন এবং ৩,৬৪৩টি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে।
মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সম্প্রতি বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতাকে অবশ্যই আমাদের অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিতে হবে। আমেরিকার সম্মতি ছাড়া তিনি বেশি দিন টিকতে পারবেন না। ট্রাম্প আরও দাবি করেন যে, মার্কিন হামলায় ইরানের ৪২টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়েছে এবং ইরানকে রাশিয়ার তথ্য দেওয়ার বিষয়ে তিনি সব খবর রাখছেন।
লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের হাইফা নৌঘাঁটিতে উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সফল হামলা চালিয়েছে। এছাড়াও ইসরায়েলের উত্তরের মিসগাভ ঘাঁটিতে রকেট হামলা চালিয়েছে তারা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে যে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে লড়াই করতে গিয়ে তাদের ২ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এই প্রথম লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি সেনা নিহতের ঘটনা ঘটল। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ৮৩টি শিশু রয়েছে।
যুদ্ধ এখন আর কেবল ইরান ও ইসরায়েলে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। কুয়েতের প্রধান বিমানবন্দরে ড্রোনের আঘাতে জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে গেছে। জর্ডানের আজরাক শহরে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরান কয়েকবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরাকের ইরবিলে মার্কিন ঘাঁটির কাছে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। বাহরাইন দাবি করেছে, তারা ইরানের ৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৪৮টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ইতালি তাদের ২০ হাজার নাগরিককে বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী এবং এটি গোপন কোনো বিষয় নয়। রাশিয়া ইরানকে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পেতে সাহায্য করছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল কৌশল এখন ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ আয়রন ডোম নিঃশেষ করা। অন্যদিকে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানের পারমাণবিক ও তেল স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ৬ মাস ধরে তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর জানালেও, বেসামরিক মানুষের লাশের মিছিল বিশ্বকে এক মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান মানচিত্র এখন রক্ত আর আগুনে আঁকা। বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা এই ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের নিরপরাধ শিকার হচ্ছেন। ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি বনাম ইরানের এক ইঞ্চি জমিও ছাড় না দেওয়ার সংকল্প, এই দুই মেরুর লড়াইয়ে মানবতা আজ পরাজিত। বিশ্ব সম্প্রদায় যদি দ্রুত কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার পথ খুঁজে না পায়, তবে ২০২৬ সালটি ইতিহাসের পাতায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বছর হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
হাআমা/
