ইসলাম ডেস্ক :: আপনি হজে গিয়ে থাকলে অবশ্যই কোথাও না কোথাও যাবেন। নূরানী আবহের সব অঞ্চলে যখন ঘুরবেন তখন মনেও আনন্দ পাবেন। পবিত্র মক্কা নগরীর ইতিহাস আর প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী হয়ে আছে শত শত বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের। নির্বাসন, বিদ্রোহ, বাণিজ্য আর রূপান্তরের এক দীর্ঘ ইতিহাসের নাম মক্কা। পবিত্র মক্কা নগরী সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা অনেকেরই অজানা। তেমনই কিছু বিষয় এখানে তুলে ধরা হলো-
হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরদের মক্কা ত্যাগ : সাধারণত মনে করা হয়, নবী হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধররা প্রাচীনকাল থেকে নবী কারিম (সা.)-এর সময় পর্যন্ত মক্কায় নিরবচ্ছিন্ন বসবাস করেছেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। হজরত ইসমাইল (আ.) ইয়েমেনের জুরহুম গোত্রে বিয়ে করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় এই গোত্রই মক্কা শাসন করে।
কিন্তু এক সময় জুরহুমরা হাজিদের ওপর অনাচার ও কাবার অবমাননা শুরু করলে ইয়েমেনি গোত্র ‘খুজাআ’ তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এমনকি তারা জুরহুমদের পরাজিত করে মক্কা থেকে বিতাড়িত করে এবং কাবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
পরবর্তীকালে ৫ম শতকে কোরাইশরা পুনরায় মক্কার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
জমজম কূপ আবিষ্কার : মক্কা ছাড়ার সময় জুরহুমরা জমজম কূপে মূল্যবান সম্পদ পুঁতে রেখে গিয়েছিল বলে জানা যায়। তখন তারা এই কূপটি ভরাট করে দেয়। দীর্ঘ সময় এটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে। নবী কারিম (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ পেয়ে এটি পুনরায় খনন করেন।
আজও এই কূপের পানি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা মিটিয়ে যাচ্ছে।
মক্কার ঐতিহাসিক ‘শান্তি প্রতিজ্ঞা’ : মক্কায় আগত বিদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর স্থানীয় প্রভাবশালীদের জুলুম বন্ধ করতে এক ঐতিহাসিক জোট গঠিত হয়েছিল, যা ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে পরিচিত। নবী কারিম (সা.) নিজেও যুবক বয়সে এই প্রতিজ্ঞায় শরিক ছিলেন।
নবুওয়ত পাওয়ার পর এর প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘যদি ইসলাম আসার পরেও আমাকে এমন কোনো চুক্তিতে ডাকা হতো, তবে আমি তাতে সাড়া দিতাম।’
এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম পূর্ব মক্কায়ও ন্যায়বিচারের একটি চেষ্টা ছিল।
মক্কার ‘হারাম’ সীমানা ঘোষিত : মক্কার চারপাশে একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘হারাম’ বা পবিত্র ঘোষণা করা হয়েছে। এই সীমানার ভেতর যুদ্ধ-বিগ্রহ, গাছ কাটা এমনকি বন্যপ্রাণী শিকার করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
নবীজি (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন ঘোষণা করেছিলেন, ‘এই শহরকে আল্লাহ পবিত্র করেছেন… এর কোনো কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা যাবে না এবং এর শিকার তাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।’ -সহিহ বোখারি: ১৮৩৩
সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের স্মৃতি : হজের অন্যতম অংশ হলো- সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ানো। এটি মূলত হজরত হাজেরা (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক কষ্টের স্মৃতি, যখন তিনি শিশু ইসমাইলের পানির জন্য এই দুই পাহাড়ের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন।
আল্লাহতায়ালা এই কাজটিকে কেয়ামত পর্যন্ত ইবাদত হিসেবে কবুল করে নিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।’ -সূরা আল বাকারা: ১৫৮
আবরাজ আল-বাইত : বর্তমানের মক্কা অতীতের চেয়ে অনেক আধুনিক। মক্কার বিশাল ঘড়ি মিনার বা আবরাজ আল-বাইত কমপ্লেক্স এখন সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে পরিচিত।
তবে এই আধুনিকায়নের মাঝেও মক্কার সেই আধ্যাত্মিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়। প্রতিদিন কয়েক লাখ হাজি এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন।
মক্কার চিরস্থায়ী নিরাপত্তা : ইসলামের আগমনের বহু আগে থেকেই মক্কা ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে উত্তরে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত কাফেলাগুলোর জন্য ছিল নিরাপদ বিরতিস্থল। পবিত্র কোরআনেও এই বাণিজ্য সফরের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে। -সূরা কোরাইশ: ১-২
মক্কার এই বাণিজ্যিক সফলতার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল এর পবিত্রতা, হারাম শরিফে যুদ্ধ নিষিদ্ধ থাকায় আরবের বিভিন্ন গোত্র এখানে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য ও মধ্যস্থতা করতে পারত।
এছাড়া মক্কার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- এর নিরাপত্তা। দাজ্জালের ফেতনা থেকেও এই শহর নিরাপদ থাকবে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘মক্কা ও মদিনা ছাড়া এমন কোনো শহর নেই যা দাজ্জাল পদদলিত করবে না…।’ -সহিহ বোখারি: ১৮৮১
এই নিরাপত্তা কেবল জাগতিক নয়, বরং এটি খোদ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি।
এমকে/৩৬নিউজ
