ইসলামে শ্রমিক-মালিক ভাই ভাই

by naymurbd1999@gmail.com

মাসউদুল কাদির :: শ্রমিক একজন মেহনতি মানুষের নাম। ফাঁকিবাজ কখনো শ্রমিক নন। কাজের মানুষই শ্রমিক। যিনি কাজে থাকেন তিনি মূলত একটি শিল্পে ব্যস্ত থাকেন। কাজের মানুষকে আল্লাহও পছন্দ করেন। যিনি কাজকে অবহেলা করেন তিনি কখনো জিততে পারেন না। হারো পার্টির লোক তিনি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, শ্রমিকের মজুরি তার ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধ করতে হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৪৪৩)

বিজ্ঞাপন
banner

কী কারণে ঘাম শুকানোর আগের কথা বলা হয়েছে? শ্রমিকের ঘামের সঙ্গে তার পরিশ্রম যুক্ত। প্রতিটি ফোঁটাই তার পরিশ্রমের কারণে ঝরেছে। এতে শ্রমিক সম্মানবোধ করবেন। নবীজী যে সম্মান শ্রমিককে দিয়েছেন তা রীতিমতো বিস্ময়ের বিষয়।

যিনি কাজ করেন, শ্রম দেন, তিনি সবসময় সম্মানিত ব্যক্তি। একটু ভেবে বলুন, একেবারে নিচের লেভেলে বা স্তরে কাজ করেন একজন মেথর। আপনার টয়লেট আটকে গিয়েছে। এখন একজন লোক আপনি হায়ার করে নিয়ে এলেন। তিনি এসে আপনার বাসার লাইন ক্লিয়ার করে দিয়ে গেলেন। বিপদমুক্ত হলেন। হয়তো তিনি সামান্য টাকা নেবেন। কিন্তু আপনার তো বড় উপকার করে দিয়ে গেলেন। আপনার এটা বুঝতে হবে, তিনি আপনার সেবাপ্রদানকারী ব্যক্তি। আপনি নন, আপনাকে ‘সেবা’ দিয়ে গেছেন তিনি। সুতরাং এতে আমরা কী বুঝতে পারি, নিশ্চয়ই এ লোকটি আপনার কাছে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হবেন। কারণ, তিনি আপনার একটি উপকার করে গিয়েছেন। তাই শ্রমিককে মর্যার চোখে দেখতে হবে। কারণ, শ্রমিক আমার ভাই। বন্ধু। নিম্নশ্রেণি বা স্তর বলতে কিছু নেই। সমাজের জন্য সবাই কাজ করছেন। প্রতিটি স্তর কিংবা পর্যায়ের মানুষই আমাদের কাছে অতি প্রয়োজনীয়।

ইসলাম শ্রমিককে কখনো ছোট করে দেখে না। কোনো নিম্নস্তরের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না। বরং তাকে ‘ভাই’ হিসেবে অভিহিত করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই, তোমরা যা খাও, তাদেরও তা খেতে দাও, তোমরা যা পরো, তাদেরও তা পরতে দাও। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩০)

কিছু বিষয় অবশ্যই শ্রমিক মালিক সবাইকে মেনে চলা উচিত। যেমন আমানতদারিতা। আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মোমিনের পরিচয় উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘তারা (মুমিনরা) সেসব লোক, যারা আমানতের প্রতি লক্ষ রাখে এবং স্বীয় অঙ্গীকার হেফাজত করে।’ (সুরা মুমিনুন : আয়াত ৮)

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, আমানতসমূহ তার প্রকৃত পাওনাদারদের নিকট প্রত্যর্পণ করতে।’ (সুরা নিসা : আয়াত ৫৮)

আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যার মধ্যে এই চার স্বভাব রয়েছে, সে খাঁটি মুনাফিক; আর এর যেকোনো একটি যার মধ্যে রয়েছে, তার মধ্যে মুনাফিকের লক্ষণ বিদ্যমান, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। ১. আমানত খিয়ানত করে, ২. মিথ্যা বলে, ৩. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ও ৪. বিবাদে অশ্লীল কথা বলে। (বুখারি : ৩৩)

সুতরাং শ্রমিক-মালিক উভয়ই আমানত রক্ষা করবেন। সময় আমানত, নির্ধারিত কাজ আমানত, যে কাজে আপনি নিয়োগ পাবেন সে কাজ জানা আমানত। মালিকের সম্পদও আমানত।

শ্রমিকের অধিকারের ক্ষেত্রে অবশ্যই মালিককে সচেতন হতে হবে। শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমগ্রহীতার কর্তব্য সম্পর্কে প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘শ্রমিকেরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ–তাআলা তাদেরকে তোমাদের দায়িত্বে অর্পণ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যার ভাইকে তার দায়িত্বে রেখেছেন, সে যা খাবে তাকেও তা খাওয়াবে; সে যা পরিধান করবে তাকেও তা পরিধান করাবে; তাকে এমন কষ্টের কাজ দেবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে। কোনো কাজ কঠিন হলে সে কাজে তাকে সাহায্য করবে।’ (মুসলিম ও মিশকাত)

এটা নিয়ম। নবীজির ভাষ্য অনুযায়ী সমাজ গড়তে পারলে এখানে আলো জ্বলবেই।

শ্রম অবশ্যই ইবাদত। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন সালাত পূর্ণ করা হবে, তখন জমিনে ছড়িয়ে পড়ো; আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো—আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।’ (সুরা জুমুআহ্ : আয়াত ১০)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ফরজ ইবাদতসমূহের পরেই হালাল উপার্জন অন্যতম ফরজ ইবাদত।’ (তিরমিজি) ‘হালাল উপার্জনসমূহের মধ্যে তা-ই সর্বোত্তম, যা কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হয়।’ (মুসলিম)

শ্রমিকের কাছে নিজের কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন হয় তাকে আল্লাহর রাসূল উত্তম বলেছেন। শ্রমিক যদি সুন্দরভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় কাজ করেন, মালিক যদি নবীজির আদর্শে অফিস পরিচালনা করেন সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে না। এ প্রক্রিয়ায় আমরা এ সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। গড়ে তুলতে শান্তির পৃথিবী।

লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক

এ জাতীয় আরো সংবাদ

প্রকাশক: আবু সায়েম খালেদ
পরিচালক: এইচ. এম. মুহিউদ্দিন খান
আসকান টাওয়ার, ৬ষ্ঠ তলা, ১৭৪ ধোলাইপাড়
যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪
ইমেইল: info@36news24.com
ফোন: 01401 400222