২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতেই বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধাবস্থা। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা, সমুদ্রপথে অবরোধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মাঝে একটি নতুন ১৪ দফা প্রস্তাব পেশ করেছে তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবের ‘ধারণা’ সম্পর্কে অবহিত হলেও এর কার্যকারিতা এবং শর্তাবলী নিয়ে এখনো সন্দিহান।
গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটিতে বোমাবর্ষণ শুরু করে। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের প্রায় ২০% জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত চার সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের বোমাবর্ষণ স্থগিত রাখলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরান একটি কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে। তাদের নতুন প্রস্তাবে পরমাণু আলোচনার চেয়ে যুদ্ধ বন্ধ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো হলো:
নৌপথ উন্মুক্ত করা: হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু করা।
অবরোধ প্রত্যাহার: যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।
সামরিক প্রত্যাহার: ইরানের আশেপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া।
অর্থনৈতিক দাবি: ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান।
আঞ্চলিক শান্তি: লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরান বর্তমানে পরমাণু আলোচনাকে পরবর্তী ধাপের জন্য সরিয়ে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। আগে শান্তি স্থাপন ও অবরোধ প্রত্যাহার হবে, তারপর পরমাণু ইস্যুতে আলোচনা চলবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। একদিকে তিনি ইরানকে ‘যথেষ্ট মূল্য দিতে হয়নি’ বলে দাবি করছেন, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সংকটের মুখে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে মার্কিন গ্যাসোলিন পাম্পগুলোতে।২০২৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে, যা রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইরান যদি কোনো ‘ভুল আচরণ’ করে, তবে পুনরায় বিমান হামলা শুরু করা হবে। তিনি কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার আইনি সক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেছেন।Politics
ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, পরমাণু ইস্যুকে আলোচনার শেষ ধাপে নিয়ে যাওয়া একটি ‘বড় ছাড়’। তাদের লক্ষ্য হলো প্রথমে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যাতে স্থায়ী শান্তি সম্ভব হয়। ইরান এখনো তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছে, যদিও তারা শান্তি চুক্তির বিনিময়ে সাময়িক স্থগিতাদেশে রাজি হতে পারে।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস মনে করছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া যেকোনো চুক্তি হবে অর্থহীন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তারা আমাকে চুক্তির ধারণাটি বলেছে, এখন আমি লিখিত নথির অপেক্ষায় আছি।
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার কালো ছায়া দেখা দিয়েছে। যদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া না হয় এবং মার্কিন অবরোধ বহাল থাকে, তবে জ্বালানি সংকট আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬ সালের ৩ মে পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বল এখন হোয়াইট হাউসের কোর্টে। ট্রাম্প কি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরানের প্রস্তাব মেনে নেবেন, নাকি পরমাণু ইস্যুতে অনড় থেকে পুনরায় সামরিক অভিযানের পথে হাঁটবেন? এর ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা। ইরানের এই নতুন প্রস্তাব একটি কূটনৈতিক সাফল্যের সুযোগ তৈরি করলেও, অবিশ্বাসের দেয়াল এখনো অনেক উঁচু।
হাআমা/
